যুক্তরাজ্য সফর শুরু করেছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। লাল গালিচা পেতে রক্ষণশীল ধারার সরকারি দল ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টি তাকে অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুত। তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় মোহাম্মদ বিন সালমানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে বিরোধী দল ও মানবাধিকার কর্মীরা।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রচারণাও চালানো হচ্ছে সফররত যুবরাজের বিরুদ্ধে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে উঠে এসেছে মোহাম্মদ বিন সালমানের যুক্তরাজ্য সফরের এই খবর। যুবরাজের সফরকালিন দুই দেশের মধ্যে বিপুল অর্থের একাধিক চুক্তি হতে পারে বলে খবর দিয়েছে ফিনান্সিয়াল টাইমস।

মানবাধিকার কর্মীদের উদ্যোগে স্থানীয় সময় বিকাল ৫টা থেকে লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিটে এই সফরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচী শুরু করার কথা জানিয়েছে আল জাজিরা। প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের সঙ্গে যুবরাজ সালমানের দেখা করার কথা বৃহস্পতিবারে, প্রধারমন্ত্রীর বাসভবনে।

প্রতিবাদকারীরা প্রচারণা গাড়ি নিয়ে লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছেন। প্রচারণা গাড়িতে লাগানো পোস্টারে লেখা হয়েছে, ‘যুদ্ধাপরাধী মোহাম্মদ বিন সালমানকে যুক্তরাজ্যে স্বাগত জানানো উচিত নয়।’

যুক্তরাজ্যের হাজার হাজার মানুষ সালমানের সঙ্গে বৈঠক বাতিল করার জন্য প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মের কাছে অনলাইনে আবেদন দাখিল করেছেন। তাদের বক্তব্য, মে যেন সালমানের কাছে মানুষ হত্যা বন্ধের দাবি জানান।

আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীরা এমন ছবিও দিয়েছেন, যেখান দেখা যচ্ছে যুবরাজকে স্বাগত জানিয়ে প্রচারণা গাড়ি বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করেছে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন অবশ্য ৩২ বছর বয়সী যুবরাজের প্রশংসা করেছেন তার ‘ভিশন ২০৩০’ রূপকল্পের জন্য। তিনি মনে করেন, সৌদি আরবকে আধুনিক করতে সংস্কার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যুবরাজ। ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে বরিস লিখেছন, সৌদি আরবের এখন যুক্তরাজ্যের সমর্থন দরকার।

উল্লেখ্য, যুবারাজ সালমান সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালানো ও দেশটিতে চলচিত্র দেখার ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেছেন। ভালবাসা দিবস উদযাপনও শুরু হয়েছে সেখানে।কিন্তু মানবাধিকার কর্মীদের বক্তব্য: মধ্যপ্রাচ্যের ক্রীড়ানক এই দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি এখনও খুব খারাপ।

সৌদি যুবরাজের দৃশ্যমান সংস্কার কর্মসূচি দেখেও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কমেনি মানবাধিকারকর্মীদের। প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টিও সোচ্চার মানবাধিকার হরণের বিরুদ্ধে। দলের শীর্ষ নেতা জেরেমি করবিন প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী মের উচিত যুবরাজকে জানিয়ে দেওয়া, সৌদির নেতৃত্বে ইয়েমেনে যে ‘ভয়াবহ’ বোমাবর্ষণ হচ্ছে তা চলতে থাকলে ব্রিটেন আর তাদেরকে অস্ত্র সরবরাহ করবে না। তার বক্তব্য, ‘মের উচিত সৌদি আরব জুড়ে ব্যাপক মাত্রায় যেভাবে মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয় তার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান ব্রিটেনের।’

২০১৫ সালের মার্চ মাস থেকে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সেনা ইয়েমেনে বোমাবর্ষণ শুরু করলে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গরিব দেশটিতে মানবিক পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়। ইয়েমেনে অন্তত ১০ হাজার মানুষ ইতোমধ্যে মারা গেছে।

যুক্তরাজ্যের অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকটি সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী। যুক্তরাজ্য সরকার হাজার হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র সৌদি আরবে রপ্তানি করার অনুমতি দিয়েছে গত তিন বছরে। কনজারভেটিভ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সালমান ও মের বৈঠকের আলোচ্যসূচির মধ্যে জঙ্গিবাদ, চরমপন্থা, ইয়েমেন সঙ্কট, সেখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রাধান্য পাবে।

ফিনানশিয়াল টাইমস তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুবরাজের সফরকালে সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্য একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে । বেডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল রজার্স আল জাজিরাকে বলেছেন, যুক্তরাজ্য সরকার সৌদি আরবকে অস্ত্রের অনেক বড় বাজার হিসেবে দেখে। সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তলার বিশেষ কোন চিন্তা নেই এই সরকারের।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য