জীবন বাজী রেখে যুদ্ধে দেশ স্বাধীন করলেও, সেই যোদ্ধা মজনু মিয়া এখন গুচ্ছগ্রামে বসবাস করে আসছে। ৭১’এ মজনু মিয়া ছিলেন টগবগে একজন যুবক। সেই সময় দেশটা ছিল উত্তাল, বাংলাকে নিজের রূপে রূপ দেওয়ার নেশায় কাপছিল পুরো দেশ। পাকিস্থানীদের শোষণ আর ব্যবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিলেন এদেশের আপামর জনগণ। ঠিক তখনই মজনু মিয়া জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশকে রক্ষার্থে ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বাধীকার আদায়ের জন্য। তার অদম্য সাহস আর দেশপ্রেম তাকেও নিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধে। গাইবান্ধা জেলার সাদুল্যাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের জয়েনপুর গ্রামের মৃত খবির উদ্দিনের ছেলে মজনু মিয়া। তার বয়স প্রায় ৬৩ বছর। বসতভিটা সর্বস¦ হারিয়ে বর্তমানে জয়েনপুরস্থ গুচ্ছগ্রামে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর বসবাস করে আসছেন।

যুদ্ধকালীন ১১নং সেক্টরে মজনু মিয়ার সহযোদ্ধা হিসেবে ছিলেন-আবেদ আলী, সুলতান গিয়াস ও আলতাফ হোসেন। এই মহাবীরের এমন অনেক সফল সাহসী অভিযান হয়েছিল মুক্তি যুদ্ধকালীন সময়ে। দেশ হয়েছিল স্বাধীন। জনগণ পেয়েছে স্বাধীনতার সুখ। এক্ষেত্রে তৎকালীন সময়ের অধিনায়ক মহম্মদ আতাউল গনি ওসমানী স্বাক্ষরীত দেশ স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্র প্রাপ্ত হয় মজনু মিয়া। যার সনদ নম্বর ১৬৫৮৮৫। অতি দুঃখের বিষয় যে, মজনু মিয়া সংগ্রামের সনদ পেলেও, অদ্যবদিও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পায়নি। যুদ্ধে দেশ স্বাধীন করলেও, জীবন যুদ্ধে তিনি আজ পরাজিত সৈনিক। দেশ স্বাধীনের ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও কোন সরকারি সুযোগ-সুবিধা কিংবা মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পায়নি বলে তার অভিযোগ।

প্রতিবেদককে মজনু মিয়া জানান, ভারতের কাকড়ীপাড়ায় আজিম মাহবুর এর নিকট প্রশিক্ষণ গ্রহন করার পর নিজ জেলা গাইবান্ধার কামারজানি, কঞ্চিবাড়ী ও দক্ষিণ দূর্গাপুর সহ বিভিন্ন এলাকায় অধিনায়ক আঃ হামিদ পালোয়ান ও ক্যাপ্টেন হামিদ উল্লার নেতৃত্বে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা হয়েছিল। এ যুদ্ধে সফল ভাবে অংশ গ্রহন করায় মজনু মিয়াকে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন- বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গাইবান্ধা জেলা ইউনিটিরে সাবেক কমান্ডার নাজমুল আরেফিন তারেক, সাদুল্যাপুর উপজেলা ইউনিট কমান্ডার মেছের উদ্দিন সরকার ও ইউপি চেয়ারম্যান শাহীন সরকার। এরপর মজনু মিয়া ওই যুদ্ধের সকল প্রমানপত্রাদি দিয়ে গেজেটধারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেতে অনলাইন আবেদন সহ বিভিন্ন মাধ্যমে আবেদন করেন। এরই প্রেক্ষিতে সাদুল্যাপুর উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটি কর্তৃক বাছাইয়ে মজনু মিয়াকে বাতিল করেন।

এ বিষয়ে যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য সচিব ও সাদুল্যাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার রহিমা খাতুন বলেন, মজনু মিয়ার সংগ্রামী সনদপত্র থাকলেও ক্রমিক নম্বর ছিলনা। এ কারণে তাকে বাতিল করা হয়েছে। মজনু মিয়া বলেন, ওই সনদপত্রের অপর পৃষ্ঠায় ক্রমিক নম্বর ছিল। যার নম্বর ১৬৫৮৮৫। তবুও অহেতুক ভাবে বাতিল করেছেন যাচাই-বাছাই কমিটিগণ। এরপর বাধ্য হয়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে আপীল আবেদন করেন মজনু মিয়া। যার আবেদন নম্বর ২২০০৮। তিনি আপীল আবেদন করলেও অদ্যবধিও কোনো ফলশ্রুতি পায়নি। শেষ বয়সে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পেয়ে মৃত্যুবরণ করতে চায়, এটাই এখন মজনু মিয়ার আঁকুতি!

বর্তমানে এই মহা যোদ্ধা মজনু মিয়া স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গুচ্ছগ্রামে অসহায় জীবন যাপন করে আসছেন। এমনকি ৬ সন্তানের মধ্যে তার প্রাপ্ত বয়সের মেয়ে মোছা. মমতাজ খাতুনকে অর্থাভাবে পাত্রস্থ করাতে পারছেনা। বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়া মজনু মিয়া পেটের তাগিদে স্ত্রী লাইলী বেগমকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে শ্রম বিক্রি করে কোনোমতে দিনাতিপাত করছেন। যেন থমকে গেছে তার জীবন। মজনু মিয়া দেশ স্বাধীন করে শুধুই পেয়েছে একটি সাটিফিকেট। এটাই এখন স্মৃতি হয়ে আছে! শেষ বয়সে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পেয়ে মৃত্যুবরণ করতে চায়, এটাই এখন মজনু মিয়ার আঁকুতি!

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য