কুড়িগ্রামের উলিপুরে দুধ শীতলীকরণ কেন্দ্র না থাকায় দুধের বাজারে ধস নেমেছে । ফলে দুগ্ধ খামার গুলো মারাক্তক লোকসানের মুখে পড়ে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে উপজেলার ৫৪টি চরাঞ্চলের প্রান্তিক পর্যায়ে গাভী মালিকরা দুধের দাম আশানুরুপ না পাওয়ায় গাভী পালনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। বন্ধ হয়ে গেছে অনন্ত ২০টি খামার।

ফলে খামারের সাথে যুক্ত প্রায় ৫ শতাধিক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। হতাশ হয়েছে বেশ কিছু নুতন নারী ও তরুন উদ্দ্যোক্তা । উপজেলা প্রানী সম্পদ বিভাগ সুত্রে জানা গেছে,উপজেলায় ৪৩টি দুগ্ধ খামার ও ৫৪টি চরাঞ্চলের প্রান্তিক পর্যায়ে শতাধিক ছোট ছোট খামার(৮/১০টি দেশী গাভী পালন করে)। সব মিলে দেশী গাভী ২৬ হাজার ৯৬১টি ও খামার গুলোতে উন্নত সংকর জাতের গাভী ৪ হাজার ৮০৭টি সর্ব মোট ৩১৭৬৮টি গাভী থেকে বছরে ১০ লাখ ৮ হাজার ৩৬ মে.টন দুধ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে স্থানীয় চাহিদা ৫২ হাজার ৯২৫মে,টন বাদ দিয়ে বছরে প্রায় ৫৫ হাজার ১১১ মে,টন দুধ উদ্বৃত্ত থাকে।

যা বাজারে বিক্রি করতে হয় কিন্ত ক্রেতা ও সংরক্ষনের অভাবে বাজারে প্রতি লিটার দুধ ২৫/৩০ টাকা ও চরের বাজারে ২০/২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সঠিক মুল্য না পাওয়ায় খামার ও গাভী মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পড়েছে লোকসানের মুখে। লোকসান পুষিয়ে নিতে না পেরে অনেকে খামার বন্ধ করে দিয়ে হাত পা গুটিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। চরাঞ্চলের গাভী মালিকদের ও একই ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে। ফলে তারা গাভী পালনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। গত ২ বছর আগে বেসরকারী একটি সংস্থা ব্র্যাক চিলিং সেন্টার স্থাপন করে দীর্ঘ দিন ধরে খামার ও প্রান্তিক গাভী পালন মালিকদের কাছ থেকে দুধ ক্রয় করত। তখন দুধের বাজার ভাল ছিল।

চিলিং সেন্ট্রারকে কেন্দ্র করে প্রচুর খামার গড়ে উঠে। কিন্ত হঠাৎ গত ২০১৭ সালে চিলিং সেন্ট্রারটি প্রত্যাহার করে নিলে দুধের বাজার মারাক্তক ভাবে হ্রাস পায়। বন্ধ হয়ে যায় বাণিজ্যিক ভাবে গড়ে ওঠা দুগ্ধবতী গাভীর খামার (২হাজার গাভী ধারন ক্ষমতা) শহীদ এন্ড ব্রাদার্স ডেইরী ফার্মস লিমিটেড, আঃ মালেক, হাসান আলী, মাহবুব ও ফিরোজ আলম সহ ২০টি খামার। সম্প্রতি বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিডেট কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষে জরিপ করেছে। দুগ্ধ শীতলীকরন কেন্দ্র স্থাপিত হলে তারা আবার খামার চালু করবেন। চরাঞ্চলে ঘুরে দেখা গেছে, আবাদ শুন্য চরের মানুষ দারিদ্রতা মোচনে প্রান্তিক পর্যায়ে ঘরে ঘরে দেশী গাভী পালন করছে।

তাদের জীবিকা নির্বাহে প্রধান অবলম্বন হচ্ছে গাভী পালন। দুধের দাম কম হওয়ায় গাভী মালিকরা দুধ থেকে ছানা তৈরী করে ছানা পচে যাওয়ার ভয়ে শহরের বিভিন্ন হোটেল রেস্তারায় মহাজনদের বেধে দেয়া দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। তাই অনেকে গাভী পালন করা বাদ দিয়েছেন। প্রান্তিক খামারী হ্জ্জ মোল্লা(৭৫)জানান বিশাল চরে দেশী গাভী ও মহিষ পালনে খড় ছাড়া কোন কিছুই কিনতে হয় না রোগ ব্যাধী মুক্ত থাকে। ফলে চরের মানুষের প্রধান আয়ের একটি বড় অংশ আসে গাভী পালন থেকে। কিন্ত দুধের বাজার না থাকায় অনেকে গাভী পালনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে।

একই কথা জানালেন তরুন উদ্দ্যোক্তা মোঃ নুর ইসলাম। আল ইমরান ডেইরী ফার্ম এর মালিক মোছাঃ লাভলী বেগম জানান, তার খামারে ৩৪টি উন্নত সংকর জাতের গাভী রয়েছে তার মধ্যে ২২টি দুগ্ধবতী। প্রতিদিন ৫ মন দুধ উৎপাদন হয়। কিন্ত এখানে দুধ ক্রয় কেন্দ্র চিলিং সেন্টার বা দুগ্ধ শীতলী করন কেন্দ্র না থাকায় বাধ্য হয়ে বাজারে ২৫/৩০ টাকা, কখন ও জেলা সদর অথবা পাশ্ববর্ত্তী রাজারহাট উপজেলায় নিয়ে বিক্রি করে কোন রকমে খামার টিকে রেখেছেন। ব্যাপারী এ্যাগ্রো ফামৃ লিমিটেড এর প্রপ্রাইটার বিএম আবুল হোসেন জানান তিনি ৫শতাধিক গাভী পালনের শুরু করে দুধের বাজার না থাকায় লোকসান খেয়ে গাভী বিক্রি করে খামার বন্ধ রেখেছেন।

উপজেলা প্রানী সম্পদ কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল আজিজ প্রধান জানান,উপজেলার প্রায় অর্ধেক চর এলাকা এখানে গাভী পালনের অনেক সম্ভবনা থাকলে ও চিলিং সেন্টার না থাকায় সে সম্ভবনা ঝুকির মধ্যে পড়েছে। পাশাপাশি দুধের বাজারে ধস নামায় গাভী খামার ও ব্যক্তি পর্যায়ে গাভী পালনে উৎসাহ হারাচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, এখানে গাভী পালনের প্রচুর সম্ভবনা থাকলেও দুধ সংরক্ষন ও বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবে তা গড়ে উঠতে পারচ্ছে না। তবে চিলিং সেন্ট্রার স্থাপিত হলে খামারীরা দুধের উপযুক্ত মুল্য পাবেন এবং সম্ভবনা গুলো প্রসারিত হবে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য