যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক স্কট পাপ্পালারডো। একসময় নিজেকে বন্দুকের বৈধ মালিক বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। নাগরিকদের ব্যক্তিগতভাবে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার বৈধতা দিয়ে মার্কিন সংবিধানে দ্বিতীয় যে সংশোধনী আনা হয়েছে তারও দৃঢ় সমর্থক ছিলেন তিনি। কেবল তাই নয়, আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অধিকারের পক্ষের স্লোগানসম্বলিত একটি ট্যাটুও ছিল এ মার্কিনির।

তবে সম্প্রতি পাল্টে গেছে পরিস্থিতি। ফ্লোরিডার স্কুলে বন্দুক হামলায় ১৭ জন নিহত হওয়ার পর আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অধিকার নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে ফেলেছেন তিনি। ধ্বংস করেছেন নিজের রাইফেলটি। তার মতে, মানুষের জীবনের চেয়ে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের অধিকারের প্রশ্নটি বেশি জরুরি হয়ে যায়নি।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ফ্লোরিডার ফোর্ট লডারডেলের মারজোরি স্টোনম্যান ডগলাস হাই স্কুলে বন্দুক হামলা চালানো হয়। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে গোলাগুলির পর হামলাকারী হিসেবে আটক করা হয় স্কুলটির সাবেক ছাত্র নিকোলাস ক্রুজকে।

এ ঘটনায় নতুন করে সামনে আসে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে পুরনো বিতর্ক। এক পক্ষ চাইছে আগ্নেয়াস্ত্রের ওপর সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ। অন্যপক্ষ চাইছে নাগরিকদের আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অধিকারে যেন কোনও ধরনের ব্যত্যয় না ঘটে। মার্কিন সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীতে দেশটির নাগরিকদের ব্যক্তিগতভাবে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার বৈধতা দেওয়া হয়।

তবে এখন অনেক মার্কিন নাগরিকই আগ্নেয়াস্ত্র রাখার বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। তেমনই একজন পাপ্পালারডো। ফেসবুকে পোস্ট করা এক ভিডিওতে পাপ্পালারডো বলেন, ‘আমি আজ সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে এ অস্ত্র দিয়ে যেন কখনও কারও জীবন না নেওয়া যায় তা নিশ্চিত করব। এ বন্দুকের নল কখনও কারও দিকে তাক করা হবে না। আমি মনে করি এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা প্রয়োজন। কারও জীবনের চেয়ে অস্ত্র রাখার অধিকার কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলো? যে অস্ত্র এতো বেশি মৃত্যু ও ধ্বংসের কারণ হয়ে ওঠে তা রাখা কি বেশি জরুরি?’

পাপ্পালারডো জানান, ২০১২ সালে স্যান্ডি হুক স্কুলে হামলার পর থেকেই তার মনে আগ্নেয়াস্ত্রসংক্রান্ত ভাবনাটির সূচনা হয়। ভিডিওতে তিনি বলেন: “আমার মনে আছে, স্যান্ডি হুক স্কুলে হামলার পর আমি আমার স্ত্রীকে বলেছিলাম, ‘যদি এ অস্ত্র কেবল একজন শিশুরও জীবন বাঁচাতে পারতো, তবে আমি খুশি মনে এর মালিকানা সমর্পণ করতাম’। সে ঘটনার পাঁচ বছর পার হয়ে গেছে। এবং তখন থেকে ২ শতাধিক স্কুলে বন্দুক হামলার ঘটনায় ৪ শতাধিক মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছে।”

পরিসংখ্যানও বলছে, পাপ্পালারডোর বক্তব্য ঠিক আছে। বন্দুক হামলা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘গান ভায়োলেন্স আর্কাইভের’ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্যান্ডি হুকের ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ২৩৯টি স্কুলে বন্দুক হামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৪৩৮ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে এবং নিহত হয়েছে ১৩৮ জন।

পাপ্পালারডোর ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে নিউ ইয়র্কের হাডসন ভ্যালি অঞ্চলের মিডলটাউন শহরে। এরপর দেখা যায় পাপ্পালারডো তার বৈধ নিবন্ধনকৃত এআর-১৫ রাইফেলটি দুই খণ্ড করে ফেলেছেন। পরে একটি বন্দুক তিন খণ্ড করে ছবি পোস্ট করেন তিনি।

ভিডিওতে পাপ্পালারডো আরও বলেন, ‘আমি জানি এ কাজ করার জন্য অনেকেই আমাকে নির্বোধ বলবে। কিন্তু এটি ব্যক্তিগত ইচ্ছের বিষয়।’ এ মার্কিনি জানান, তার কাছে একটি অস্ত্র আছে এবং তা একদিন হয়তো ফ্লোরিডার হামলার মতো কোনও ঘটনায় ব্যবহার করা হতে পারে; সেই উদ্বেগ মাথায় রেখে তিনি বাঁচতে পারবেন না।

যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শনিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) ভিডিওটি ফেসবুকে পোস্ট হওয়ার পর এরইমধ্যে তা ৪ লাখ বার শেয়ার হয়েছে। ২১০ লাখ বার ভিডিওটি দেখা হয়েছে। লোকজন #ওয়ানলেস টু ব্যাক পাপ্পালারডো অ্যান্ড হিজ কজ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে বছরে ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে। এ নিয়ে প্রায়সময় বিদ্যমান অস্ত্র আইন এবং অস্ত্র বিক্রেতা ও রাজনীতিকদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে গত বছরের অক্টোবরে লাস ভেগাসে বন্দুকধারীর হামলায় ৫৮ জন নিহত হওয়ার পরও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে কোনও সমঝোতায পৌঁছাতে পারেননি রাজনীতিবিদরা। ১৪ ফেব্রুয়ারি ফ্লোরিডার স্কুলে হামলার পর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের দাবিটি আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে। ফ্লোরিডার স্কুলে নির্বিচারি বন্দুক হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র আইন সংশোধনের দাবিতে বিক্ষোভ করার ঘোষণা দিয়েছে। আগামী ২৪ মার্চ ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হবে ‘মার্চ ফর আওয়ার লাইভস’ নামের এ বিক্ষোভ।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য