আরিফ উদ্দিন, গাইবান্ধা থেকেঃ গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর সর্বত্রই এখন বাজার শূন্য। চড়া মূল্যেও মিলছেনা একবিড়া পান। বরজগুলো এখন পরিণত হয়েছে পান শূন্য বরজে। ফলে এ উপজেলার পান চাষীরা চলতি মৌসুমে অর্থনৈতিক ভাবে বিপূল অংকের ক্ষতির সম্মুখিন হয়ে পড়েছেন।

অতি ক্ষরত্ব বা লবনাক্ত ঘন কুয়াশা, রৌদ্র বিহীন হিমেল শৈত্য প্রবাহ, উপূর্যপরি দু’দফা ভারী বন্যা ও পান উৎপাদনে প্রয়োজনীয় সরিষার খৈলসহ যাবতীয় উপকরনের অধিক মূল্যের কারনে উপজেলার সর্বস্তরের পান চাষী দের মাথায় হাত পড়েছে।

ভূক্তভোগি চাষীরা জানায়, তাদের বরজ এখন পান শূন্য। দৃশ্যমান শুধুই বাঁশের শলা এবং খড়-কুটো। দেখা মিলছেনা প্রত্যাশিত পানের নতুন কুশির।

সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, পানের গাছ বা পড় যদিও দন্ডায়মান কিন্তু বিরাজমান আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় নতুন করে তেমন পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠছে না। উপজেলা সদর ইউনিয়নের পানবরজ বা পানচাষী অধ্যূষিত জগরজানি গ্রামের ভূক্তভোগি ওয়াদুদ মিয়া, আব্দুর রহমান, রশিদুল, সাইফুল, হামিদুল মন্ডল, তারা মিয়া, দেলোয়ার, কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের আন্দুয়া গ্রামের হামিদুল, কাইয়ুম আলীসহ অনেক চাষীই জানান, তাদের প্রত্যেকের বরজ গুলো ছত্রাক জনিত পান গাছ গোড়াপঁচন, পান পাতায় চিঁটা দাগ, হলুদ বর্ণ ও অজ্ঞাত ব্যাকটেরিয়সহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়েছে।

চাষীদের অভিযোগ কৃষি বিভাগের দায়ীত্বশীল কোন কর্মকর্তার মাঠ পর্যায় দেখা মিলছে না। আক্রান্ত ব্যাকটেরিয়া নির্মূলে এ মূহুর্ত্বে জরুরি পদক্ষেপ ও সঠিক পরামর্শের অভিকেন্দ্র বরজে প্রয়োজনীয় কীটনাশক প্রয়োগ সিদ্ধান্তে ভূক্তভোগি পান চাষীরা নানা দ্বিধাগ্রস্থসহ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

উপজেলা কৃষি অফিসার আজিজুল ইসলাম জানান, শুধু পান চাষ নয়। গোটা উপজেলায় কুষকদের অধিক সচেতন করতে কৃষি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তাদের (বিএস) মাঠ পর্যায় তদারকি বাড়ানো হয়েছে। উপজেলায় ৯ ইউনিয়নে পৃথক ২৯টি কৃষি ব্লক রয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নেই কম-বেশি অন্ততঃসাড়ে ৯’শ পান বরজ রয়েছে। স্ব-স্ব ব্লকে নিয়োজিত সুপারভাইজার পান চাষীদের নিয়মিত সব ধরনের পরামর্শ প্রদান করে আসছেন।

পানচাষীদের মধ্যে অধিকাংশই সারা বছর জুড়ে শুধু পান বরজের আয় একমাত্র অবলস্বন। নেই কোন বাড়তি কৃষি জমি। নেই কোন বিপরীত আয়ের উৎস। অপরদিকে, তাদের মধ্যে অনেক চাষী তাদের অস্তিত্ব¡ ঠিক রাখতে বরজ বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় একান্ত বাধ্য হয়ে এলাকার পেশাদার দাদন ব্যবসায়িদের নিকট চড়া সূদে ঋণ নিয়ে দেনার দায়ে জড়িয়ে পড়ছেন।

প্রাত্যহিক পান বিক্রয় করেই যাদের গোটা পরিবারের সার্বিক ব্যয়ভার মেটাতে হয় এমন চাষীরা তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে পড়েছেন মহা বিপাকে।

ফলে; স্থানীয় বাজার প্রায় পান শূন্য হয়ে পড়েছে। পলাশবাড়ী উপজেলা সদরের ঘোড়াঘাট সড়ক ঘেঁষে ছোট শিমুলতলা, পার্শ্ববর্তি কোমরপুর চৌমাথার নির্দিষ্ট পানহাট থেকে পাইকাররা প্রতিদিন যা-ইচ্ছে পান কিনে দেশের বিভিন্ন জেলার নানা অঞ্চলে সরবরাহ করেছে। বিগত দীর্ঘদিন ওই হাট দু’টিতে এখন পান আমদানি পুরোপুরি শূন্য হয়ে পড়েছে।

সদরের কালীবাড়ী বাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে নিয়মিত পেশাদার খুচরা বিক্রেতারা পান সরবরাহ না পেয়ে তারা একেবারে হাত গুটিয়ে বসে পড়েছেন। তদুপরি দু’একজন বিক্রেতারা দূর-দূরান্তের নানা এলাকার হাট-বাজার থেকে নামমাত্র পান আমদানি করলেও মূল্য অবিশ্বাস্য-আকাশছোঁয়া।

পান কিনতে আসা খুচরা ক্রেতাদের অনেকেই পান না কিনেই খালি হাতে ফিরছেন বাড়ী। পাশাপাশি সুপারির মূল্য ধরাছোঁয়ার বাইরে। সবমিলিয়ে পান-সুপারির বাজার মূল্য অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় একেবারে অস্থির। বিক্রেতারা ছোট-বড় ও মাঝারি আকারের একবিড়া (৮০ পিস) পানের ন্যুনতম মূল্য ১’শ ২০ হতে ৫’শ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রয় করছেন।

নিরুপায় অনেক ক্রেতাই বাড়ীর গৃহীনির কথা স্মরন করে একেবারে খালিহাতে বাড়ী না ফিরে প্রয়োজনের তুলনায় অন্ততঃ দুই-এক গোন্ডা (৪ পিস) পান নিয়ে বাড়ী ফিরছেন। বিক্রেতারা জানান আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝড়া না পর্যন্ত পান বরজের সতেজতা ফিরবে না। পরিস্থিতির পরিবর্তনে বরজ মালিকরা অপেক্ষা করছেন বৃষ্টির। মৃদৃ বৃষ্টির পানিতেই পানের নতুন কুশি গজে উঠবে। আর তখনই পানের বাজার পূর্বের ন্যায় আবারো কমে আসবে। ক্রয়-বিক্রয় হবে স্বাভাবিক।

বিরাজমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় পেশাদার খিলি পান বিক্রেতার মধ্যে আমেনা বেগম, হান্নান, মহাদেব, মির্জা, মহাদেব, মির্জা, ভয়করা, জামিরুল, রুবেল, ফুল মিয়া, মানু পাগলা, মঞ্জু, জয়নাল, ইসলাম, লেবু মিয়া ও ছলেহা গলির বুলু মিয়াসহ সদরের বিভিন্ন পয়েন্টের অনেক বিক্রেতাই এখন হাত গুটিয়ে বসে পড়েছেন।

সম্প্রতি সময় তাঁরা প্রতি খিলি পান ৩-৫ টাকা মূল্যে বিক্রি করেছেন। ব্যবসা চালু রাখার স্বার্থেই একটু লোকসান হলেও অনেকেই এখনো খিলি পান বিক্রয় অব্যাহত রেখেছেন। উপরন্ত সুপারির বাজার উর্দ্ধমুখি। সবমিলিয়ে প্রতিটি খিলি ন্যূনতম বিক্রয় করতে হচ্ছে ৫ থেকে ১০ টাকায়।

অপরদিকে;বছরের পর বছর নিয়মিত পান খেয়ে যারা অভ্যন্ত তারা সংশয়ে ভুগছেন বাজার মূল্য স্বাভাবিক হলে খিলি পানের মূল্য সহনীয় পর্যায় আসবে কি-না? পানের বাজার দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীল নেপথ্যের সবটুকু কূ-প্রভাব পড়েছে বিশেষ করে অতিরিক্ত পানখোরসহ পারিবারিক ভাবে নিয়মিত পানসেবি গৃহস্থ্য পরিবার গুলোর উপর।

এমন পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র নিদ্রা ছাড়া সবসময় যারা ততোধিক পান চিবন তুলনামূলক তারা কেবল ২/১টি পান চিবিয়েই পার করছেন রাত-দিন।এলাকার বাসা-বাড়ীতে অতিথি আপ্পায়নে দেখা দিয়েছে বিড়ম্বনা।
চা-বিস্কুটসহ আপ্পায়নের সব থাকলেও পরিশেষে থাকছেনা পান। সবমিলিয়ে পানের বাজারে দেখা দিয়েছে চরম অস্থিরতা।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য