যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পার্কল্যান্ডের স্কুলে বন্দুক হামলায় ১৭ জন নিহতের ঘটনায় দেশটিতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে বিতর্ক আরও জোরদার হয়েছে। ওই বন্দুক হামলায় বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থীরা শনিবার একত্রিত হয়ে আগ্নেয়াস্ত্রের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি তুলেছে। এ সময় তাদের চেহারায় ছিল ক্ষোভ ও বিষণ্নতার ছাপ। একই সময়ে শিক্ষার্থীদের ওই অবস্থানের কাছাকাছি স্থানে একটি বন্দুক প্রদর্শনীতে অংশ নেন অনেকে। তবে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারীরা বলছেন, এই বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞের জন্য আগ্নেয়াস্ত্রকে দোষারোপ করা যায় না।

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বুধবার ফ্লোরিডার ফোর্ট লডারডেলের মারজোরি স্টোনম্যান ডগলাস হাই স্কুলে ঢুকে ওই বন্দুক হামলা চালানো হয়। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে গোলাগুলির পর হামলাকারী হিসেবে আটক করা হয় স্কুলটির সাবেক ছাত্র নিকোলাস ক্রুজকে। এ ঘটনায় নতুন করে সামনে আসছে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে পুরনো বিতর্ক। এক পক্ষ চাইছে আগ্নেয়াস্ত্রের ওপর সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ। অন্যপক্ষ চাইছে নাগরিকদের আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অধিকারে যেন কোনও ধরনের ব্যত্যয় না ঘটে।

মার্কিন সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীতে দেশটির নাগরিকদের ব্যক্তিগতভাবে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার বৈধতা দেওয়া হয়। তবে এখন অনেক মার্কিন নাগরিকই এই সংশোধনীর পরিবর্তন চাইছেন। আর তাদের এমন চাওয়ায় বাধ সাজছে বৃহৎ অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।

কঠোর আগ্নেয়াস্ত্র আইনের দাবিতে শনিবার ফোর্ট লডারডেলের সমাবেশে জড়ো হন মারজোরি স্টোনম্যান ডগলাস হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা। এ সময় স্কুলটিতে বন্দুক হামলার জন্য মানসিক অসুস্থতাকে প্রধান কারণ দায়ী করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অনেক যে বক্তব্য দিয়েছেন তা প্রত্যাখ্যান করেন ছাত্র-ছাত্রীরা।

১৮ বছরের শিক্ষার্থী এমা গোনজালেজ বলেন, আমাদের এ বিষয়ে সজাগ হতে হবে যে, বন্দুক হামলা শুধু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে ঘটেনি।

মারজোরি স্টোনম্যান ডগলাস হাই স্কুলে বন্দুক হামলার তিনদিন পর মিয়ামিতে এক আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন ৫৫ বছরের মাইক ভ্যালোন। একটি এআর-১৫ কিনছিলেন তিনি। কিন্তু প্রায় ৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র থাকার পরও তাকে কেন আরেকটি কিনতে হবে? বার্তা সংস্থা এএফপি’র এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘কারণ আমি এগুলোর মালিকানা পেতে চাই। এই মালিকানা অর্জন আমার সাংবিধানিক অধিকার। আমি সেই অধিকারের চর্চা করাটাকেই বেছে নিয়েছি।’

প্রতিবেদনে আধা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ব্যবহার করে হত্যাযজ্ঞ চালানোর বাস্তবতা তুলে ধরেছে এএফপি। এতে বলা হয়, লাস ভেগাস, টেক্সাস, নিউ টাউন ও কানেক্টিকাটে এ ধরনের নির্বিচার গুলিবর্ষণের ফলে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তবে মাইক ভ্যালোন মনে করেন, সংবাদমাধ্যমগুলো আগ্নেয়াস্ত্র বিকিকিনির সাংবিধানিক অধিকারকে বাজেভাবে উপস্থাপন করছে।

যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার দায়িত্ব পালনকালে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষপাতী ছিলেন। তবে এ নিয়ে তিনি রিপাবলিকান শিবিরের ব্যাপক বিরোধিতার মুখে পড়েন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে লেখা এক নিবন্ধে তিনি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে বাড়তি সতর্কতার ওপর জোর দেন। ওবামা বলেন, ‘শিশুরা যাতে ওষুধের বোতল খুলতে না পারে, আমরা সে ব্যবস্থা নেই। অথচ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে তেমন কোনও সতর্কতা নেই।’ রিপাবলিকান শিবির থেকে এর প্রতিবাদ জানিয়ে বলা হয়, বারাক ওবামা মার্কিন নাগরিকদের অস্ত্র বহনের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিতে চান।

২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি বছরের প্রথম সাপ্তাহিক ভাষণে বারাক ওবামা বলেন, প্রস্তাবিত বন্দুক নীতির জন্য কংগ্রেসের সমর্থন না পাওয়াকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের সবচেয়ে বড় হতাশা। বিবিসি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বন্দুক হামলায় নিহত মার্কিন নাগরিকের সংখ্যা এমনকি নাইন ইলেভেনে নিহতের সংখ্যার চাইতেও বেশি।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক বন্দুক হামলার প্রেক্ষাপটে ওবামা প্রশাসন বেশ কয়েকবার আগ্নেয়াস্ত্র আইন কঠোর করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। ২০১৩ সালে কানেকটিকাটে বন্দুকধারীর হামলায় ২০ শিশুসহ ২৬ জন নিহত হওয়ার পর অস্ত্র ক্রেতাদের তথ্য যাচাইসহ বিভিন্ন বাধ্যবাধকতার বিধান রেখে একটি যৌথ বিল পাসে ব্যর্থ হয় ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকানরা। বিলটি পাসের জন্য তখন প্রয়োজনীয় ৬০ ভোটও পাওয়া যায়নি। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড অবশ্য ট্রাম্প নাগরিকদের অস্ত্র রাখার অধিকারের পক্ষপাতী। ফ্লোরিডার স্কুলে বন্দুক হামলার ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতাকে দায়ী না করে উল্টো হামলাকারীর ‘মানসিক স্বাস্থ্য’কে দোষারোপ করেছেন তিনি।

শনিবার কঠোর আগ্নেয়াস্ত্র আইনের দাবিতে ফ্লোরিডার ফোর্ট লডারডেলের সমাবেশে এমা গোনজালেজ বলেন, প্রেসিডেন্ট যদি আমার কাছে এসে বলেন, ওই বন্দুক হামলা ছিল একটা ভয়ানক ট্রাজেডি। তবে এ নিয়ে কিছু করা যাচ্ছে না; তাহলে তার কাছে ভালোভাবে জানতে চাইতাম যে, ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনের কাছ থেকে তিনি কি পরিমাণ অর্থ পান! সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য