“সেতুবন্ধন” একটি স্ব-উদ্যোগী বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র। সেতুবন্ধন’র মাঝেই স্থানীয় বয়স্কদের শিক্ষায় সৃষ্টি হয়েছে সেতুবন্ধন। ছুটির দিনে ঘড়িতে তখন বিকেল চারটা। এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠরা শিক্ষা নিবো শিক্ষিত হবো, নিরক্ষর মুক্ত দেশ গড়বো স্লোগানে দলে দলে ছুটে চলেছে সেতুবন্ধন বয়স্ক শিক্ষা পাঠশালায়। সবার হাতেই বই-খাতা-কলম।

হঠাৎ চোখে পড়ে একটি আধাপাকা ঘরে সাইন বোর্ড ঝুলানো সেতুবন্ধন পাঠশালা।

কিছুক্ষণ অপেক্ষায় বুঝতে পারলাম এখানে বয়স্কদের শেখানো হয় লেখাপড়া। শুরু হলো তাদেরকে নিয়ে ক্লাস। ক্লাসে বাংলা বর্ণমালা শেখানো হচ্ছে। এ সময় সবাই দেখে দেখে লেখার চেষ্টাও করছে। অনেকে লেখতে পারলেও কেউ কেউ পেলো না। তাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে এলো শিক্ষিত টকবগে এক যুবক। শ্রদ্ধাভাজন বয়োজ্যেষ্ঠদের হাতে কলমে লেখতে ও পড়তে শেখাতে দেখা গেলো তাকে। নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের খালিশা বেলপুকুর গ্রামের তরুণ শিক্ষিত যুবকেরা এভাবেই এগিয়ে এসেছে গ্রামের বয়স্কদের পাশে।

খোজখবর নিয়ে জানা গেল, প্রতি শুক্রবার ওই এলাকায় অক্ষরজ্ঞানহীন বয়োজ্যেষ্ঠরা একত্রিত হয় এই সেতুবন্ধন পাঠশালায়। উদ্দেশ্য প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করা। পাখির প্রতি ভালোবাসায় পাখি বসবাসের জন্য গাছে গাছে কলসী দিয়ে বাসা তৈরীতে যাদের ছিলো অক্লান্ত পরিশ্রম। ব্যতিক্রমী এ কাজটির জন্য যারা কড়িয়ে ছিলো সুনাম। তাদের সেচ্ছাশ্রমেই গড়ে তুলেছিলেন সেচ্চাসেবী একটি সংগঠন সেতুবন্ধন।

আর এই সংগঠনের সদস্যরাই স্বেচ্ছাশ্রম ও সেবার ভিক্তিতে চলছে এ কর্মসূচি। নামকরণ হয়েছে ‘সেতুবন্ধন পাঠশালা’। কথা হয় প্রাথমিক শিক্ষা নিতে আসা আসিদা বেগম, রেজিয়া খাতুন, শাহের বানুর সাথে তারা জানায় ,একেবারে লেখতে ও পড়তে পারতাম না। এখন পাঠশালায় এসে লেখতে ও পড়তে পারি। আগে আমি টিপসই দিতাম কিন্তু এখন আর টিপসই দিতে লাগে না। আমি সাক্ষর দিতে শিখেছি। একই ভাবে জানালো বয়স্ক বাছেতুন নেছা, মোহাম্মদ হামিদ, জাহানারা বেগম আগে একটু আধটু পড়তে পারতাম কিন্তু লেখতে পারতেন না। এই পাঠশালায় এসে এখন আর বাংলা লিখতে সমস্যা হয় না।

বৃদ্ধ তৈয়ব হোসেন জানালেন, মোর বয়স অনেক হইছে বাহে। আগোত হামরা দোকানত বাকি খাছিনো। দোকানদার দাম কছিলো একখান আর খাতাত লেখিছিলো আরেক খান। হামাক সহজে ঠকেবার পাছিলো। এলা হামরা লেখিবার পাই। এখন হামাক আর কাহো ঠকেবার পাইবে না। বৃদ্ধা হাজরা খাতুন একই ভাবে বললো, হামরা পড়িবার পাইছো না দেখি মানুষজন যেঠে সেঠে হামার টিপসই নিয়া বকা বানাইছিলো। এলা বেলে হামরা পড়িবার পাই। মানুষ আর হামাক বোকা বানেবার পাইবে না। সেতুবন্ধন পাঠশালার এ কার্যক্রমে স্থানীয় ভাবে প্রশংসা কুড়ানোর পাশাপাশি দৃষ্টান্ত স্থাপনে এগিয়ে চলেছে দিনের পর দিন। এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন অনেকেই। বয়স্কদের প্রাথমিক শিক্ষার এ কর্মসূচি দারুণ আলোরণ সৃষ্টি করেছে ইউনিয়নব্যাপী।

সেতুবন্ধন পাঠশালার উদ্দ্যোক্তা ও সেতুবন্ধন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা আলমগীর হোসেন জানান, নিরক্ষর মুক্ত গ্রাম গড়ার প্রত্যাশায় গড়ে তুলেছি আমাদের এ পাঠশালা। তিনি আরো বলেন, গ্রামের অক্ষর জ্ঞানহীন মানুষের পাশে থেকে শিক্ষা ও সচেতনতাবোধ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে আমাদের এ ধারাবাহিকতা থাকবে চলমান।

তিনি বলেন, পাখি ও প্রকৃতি সুরক্ষায় কাজ করার পাশাপাশি আমরা সেতুবন্ধন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে আরো কিছু সামাজিক ও শিক্ষামূলক কাজে অবদান রাখতে চাই। এ বিষয়ে সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ বজলুর রশিদ জানান, সেতুবন্ধনের কার্যক্রম প্রশংসনীয়। এ কারণে সৈয়দপুর উপজেলা প্রশাসন সংগঠনটির স্বেচ্ছায় সেবামূলক কর্মকান্ডে সর্বাত্মক সহযোগীতা করে আসছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য