মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ রেখে বুধবার (৭ ফেব্রুয়ারি) মার্কিন সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটি একটি প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনযজ্ঞ পরিচালনাকারী মিয়ানমারের সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও ভ্রমণ প্রতিবন্ধকতা আরোপের জন্য প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়।

জন ম্যাককেইন ও বেন কার্ডিন প্রণিত বার্মা হিউম্যান রাইটস এন্ড ফ্রিডম অ্যাক্ট-কে আইনে পরিণত করতে ভোটাভুটির জন্য সিনেটে পাঠানো হবে। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভেও প্রস্তাবটি পাস করাতে হবে। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর বিলটি আইনে পরিণত হবে।

২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ছয় লাখেরও বেশি মানুষ। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এ ঘটনায় খুঁজে পেয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এই ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ‘পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ আখ্যা দিয়েছে। রাখাইনের সহিংসতাকে জাতিগত নিধন আখ্যা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ। তবে এইসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এইবার মিয়ানমারের সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বুধবার প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে আর্মড সার্ভিসেস কমিটি।

প্রস্তাবটিতে আরও অন্যান্য বিষয়ের সাথে এটাও বলা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারকে বিশেষ কিছু সামরিক বিষয়ে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকবে। যতদিন পর্যন্ত না স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এটা নিশ্চিত করতে পারবে যে ওই সেনা কর্মকর্তারা সহিংসতা থামিয়েছেন, ততদিন পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। মিয়ানমারের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাখাতের সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরেরও সুপারিশ করা হয়েছে প্রস্তাবে। প্রস্তাবটির পক্ষে বারো জনেরও বেশি সিনেট সদস্যের সমর্থন রয়েছে।

রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য জাতিগত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করে ম্যাককেইন বলেছেন, নৃশংসতা ও জাতিগত নিধন প্রতিরোধ করা জন্য যা যা করতে পারে তার সবই করবে যুক্তরাষ্ট্র। যারা এসবের জন্য দায়ী, তাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হবে, তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। মিয়ানমারের হামাগুঁড়ি দেওয়া গণতন্ত্রকে বিকাশিত হতে দেওয়া ও ছয় লক্ষ আশি হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা-বাস্তচ্যুত করার পেছনে দায়ী সেনা কর্মকর্তাদের অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রে সিনেটের প্রস্তাবটি নতুন আশার সঞ্চার করতে পারে।

সিনেটের ‘আর্মড সার্ভিসেস কমিটির’ সভাপতি ম্যাক কেইন বলেছেন, ‘উত্থাপিত প্রস্তাবটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, ধরাবাহিকভাবে চলতে থাকা নৃশংসতামূলক কর্মকাণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন তো করবেই না বরং মিয়ানমারের নাগরিকদের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে সমর্থন করবে।’

এই প্রস্তাবটি যদি শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হয় তাহলে কয়েক প্রজন্ম ধরে চলতে থাকা নৃশংসতার জন্য দায়ী সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকার সহজেই অবরোধ আরোপের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।

এছাড়াও সমস্যা সমাধানে মানবিক সহায়তা প্রদান ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে আইনটি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে সুবিধা দেবে। গণহত্যা ও জাতিগত নিধন প্রতিরোধ করা জন্য প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা নির্ধারণে এমন আইনের দরকার রয়েছে।

এ আইনটি নিপীড়নে লিপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবরোধ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করার সক্ষমতা বাড়াবে। এতে সহিংসতার আদেশ দেওয়া নিরাপত্তা কর্মকর্তা, জাতিগত নিধনের নেতৃত্ব দেওয়া জেনারেল ও রাখাইনে মাঠ পর্যায়ে যেসব সেনা কর্মকর্তারা নৃশংসতা চালিয়েছেন তাদেরকে নির্দিষ্ট করে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা যাবে।

‘রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গত কয়েক মাস ধরে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ চলা এবং দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিশ্চল থাকার মতো বড় সমস্যাকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও তৎপরতা পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার। এক্ষেত্রে আজকের প্রস্তাবটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ বলেন কার্ডিন।

এই প্রস্তাবটি পাসের পাশাপাশি সিনেটের ‘ফরেন রিলেশন কমিটি’ও একটি প্রস্তাব পাস করেছে। প্রস্তাবটিতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে দায়ী করা হয়েছে। এই প্রস্তাবটি এনেছেন সিনেটর এড মার্কে।

‘দায়মুক্তির সুযোগ কেউ যাতে না পেয়ে যায় সেজন্য আমাদের আরও বেশি সচেষ্ট হতে হবে। তা না হলে রোহিঙ্গারা আবারও নির্যাতনের শিকার হবে এবং দায়ী সেনাকর্মকর্তারা জবাবদিহিতার বাইরে থেকে যাবে’ বলেন মার্কে। তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাপক মাত্রায় যৌন সহিংসতার ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাস ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত অস্ত্র। সেনাবাহিনী যে যৌন সহিংসতাকে যে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে না তা জানাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত শক্তিশালী বার্তা দেওয়া’।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য