ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে মার্কিন উদ্যোক্তা এলন মাস্কের নতুন রকেট ফ্যালকন হেভির সফল উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হয়েছে।

শাটল সিস্টেম শুরু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী বিশালাকৃতির এই যান কোনো সমস্যা ছাড়াই সোমবার উৎক্ষেপণস্থল থেকে আটলান্টিকের ওপর দিয়ে উড়ে যায় বলে খবর বিবিসির।

উৎক্ষেপণের আগ পর্যন্ত এই উড্ডয়নকে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছিল।

স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী মাস্কও বলেছিলেন, সফলতা ও ব্যর্থতার সমান সম্ভাবনা থাকা এই রকেট উৎক্ষেপণের ওপরই নতুন রকেট নির্মাণের ভবিষ্যত নির্ভর করছিল।

“আমার চোখে ভাসছিল উৎক্ষেপণের স্থানে বিশাল বিস্ফোরণের ছবি, যেখানে রকেটের চাকা ছিটকে গিয়ে পড়বে রাস্তায়। সৌভাগ্যক্রমে তেমন কিছু হয়নি,” সফল উৎক্ষেপণের পর বলেন তিনি।

মাস্কের এই রকেটটির নকশা করা হয়েছিল পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে সর্বোচ্চ ৬৪ টন ওজনের মালামাল পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে, এ ওজন লন্ডনের রাস্তায় চলা পাঁচটি দোতলা বাসের সমান।

মাস্ক জানান, তার রকেট দ্বিতীয় শক্তিশালী রকেট ডেলটা আইভি হেভির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি ভার বহন করতে সক্ষম, অথচ খরচ পড়বে সেটির তিনভাগের একভাগ।

পরীক্ষামূলক ও উদ্দেশ্যহীন প্রথম মিশনে স্পেসএক্সের রকেটটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক কম ওজনের ভার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

এতে মাস্কের পুরনো লাল-চেরি রঙের টেসলা স্পোর্টস কার চাপিয়ে দেওয়া হয়, যার চালকের আসনে বসা স্পেস স্যুট পরা মানবমূর্তি; উৎক্ষেপণের সময়ও গাড়ির রেডিওতে বাজছিল ডেভির বাউইয়ির ক্ল্যাসিক একটি গান।

বিবিসি বলছে, ফ্যালকন হেভির সাড়ে ছয় ঘণ্টার যাত্রা সফল হলে এটি সৌরজগতের কক্ষপথে পৌঁছে যাবে, যা তাকে ধীরে ধীরে মঙ্গল গ্রহের কাছে এগিয়ে নেবে।

রকেটটিতে তিনটি স্পেসএক্স ওয়ার্কহর্স ফ্যালকন নাইন জুড়ে দেওয়া ছিল। স্পেসএক্সের অন্য সব রকেটের মতই এটিরও উৎক্ষেপণের তিনটি পর্যায়ে নিচের অংশটি মূল রকেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এর মধ্যে প্রথম দুটির নেমে আসা ছিল নিয়ন্ত্রিত, প্রায় একই সময়ে তারা কেনেডি স্পেস সেন্টারের দক্ষিণে ফ্লোরিডা উপকূলের নির্ধারিত স্থানে ল্যান্ড করে।

তৃতীয়টি কয়েকশ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রে থাকা একটি ড্রোন জাহাজে নামার কথা থাকলেও গন্তব্যে না যেয়ে ঘণ্টায় ৫০০ কিলোমিটার বেগে পানিতে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়।

ফ্যালকন হেভির নিচের অংশগুলো যখন পৃথিবীর বুকে ফিরে আসছিল উপরের অংশ তখন টেসলা গাড়িটিকে নিয়ে ছুটছিল মহাশূন্যের পথে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় এবং শক্তিশালী এ রকেটের সফল উৎক্ষেপণের মাধ্যমে ইলন মাস্ক ও তার স্পেসএক্স কোম্পানি মহাকাশ যাত্রায় নতুন দ্বার খুলে দিল।

এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক বাহিনী এখন চাইলে আরও বড় উপগ্রহ মহাশূন্যে পাঠাতে পারবে; এই রকেটে করে একসঙ্গে অসংখ্য উপগ্রহ পাঠানো যাবে যা দিয়ে সারা পৃথিবীতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করা যাবে।

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মতো বড় বড় টেলিস্কোপ উপগ্রহে সংযুক্ত করা যাবে; শক্তিশালী ও আরও সক্ষমতাসম্পন্ন রোবট মঙ্গলের বুকে কিংবা বৃহস্পতি ও শনির বাইরের কক্ষপথ ও চাঁদগুলোতে পাঠানো সম্ভব হবে।

মাস্কের বিশ্বাস, কম খরচ হওয়ায় এটির বুস্টারগুলোকেও উদ্ধার করে পুনঃব্যবহার করা যেতে পারে, যা রকেট প্রযুক্তিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটিয়ে দেবে।

“অন্য সব ভারী রকেটের খেলা শেষ করে দেবে এটি। অনেকটা এয়ারক্রাফট বিক্রির মতো, যেখানে একটি কোম্পানি পুনঃব্যবহারযোগ্য এয়ারক্রাফট বিক্রি করছে, অন্যরা বিক্রি করছে একবার ব্যবহার করা যায় এমন এয়ারক্রাফট, যা গন্তব্যে পৌঁছলে আপনাকে প্যারাস্যুট পরে লাফিয়ে নামতে হবে, আর এয়ারক্রাফটটি কোনো এক জায়গায় বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। পাগলামি শোনালেও, রকেটের ব্যবসা এখনো এমনভাবেই চলছে,” বলেন তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য