শীত মৌসুমে তিস্তা নদীর বুকে জেগে ওঠে ছোট বড় -চর। এসব চরে এখন পা পড়েছে মানুষের । সবুজে সবুজে ভরে গেছে চরগুলো। থোকায় থোকায় ধরেছে কাঁচা মরিচ। আর এই মরিচ বিক্রি করে অনেকই এখন স্বাবলম্বী হয়েছে। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তার চরে প্রতি বছর এভাবেই মরিচের চাষ হয়। এই আবাদ দিয়ে সুদিনও ফিরিয়েছে অনেক চাষী। তারা আজ স্বাবলম্বী,দু’বেলা মোটা ভাত আর কাপড়ে সুখেই দিন যায় তাদের।

স্থানীয় ভাষায় মরিচকে আকালি বলা হয়। মরিচ নিয়ে এ অঞ্চলে একটি জনপ্রিয় ভাওয়াইয়া গানও রয়েছে। ‘কাইনচ্যাৎ গারিনু আকাশি আকালি, আকালি ঝুমঝুম করে রে বন্ধুয়া,বাতাসে হেলিয়া পড়ে, সাইল ডাইরকা মাছোতে দিনু জোড়া আকালি, তুসতুস করিয়া পিঁয়াজও কুটিয়া দেইম আরও সালুক ও নাপা,খাইমেন গন্ধে গন্ধেরে বন্ধুয়া, আকালি ঝুমঝুম করে …।’

এই গানের কলির মতো তিস্তার চরে বিস্তৃত মরিচ খেতে মরিচগুলো যেন সত্যিই ঝুমঝুম করে সাফল্যের বাজনা বাজায়। তিস্তা নদী বেষ্টিত ২৯টি চরে এখন ১২’শ একর জমিতে এক হাজার পরিবার মরিচ চাষ করছে। আর চরে মরিচ চাষের প্রথম স্বপ্ন দেখেন উপজেলার আরাজী হরিশ্বর গ্রামের আমির আলী (৬৬)। মরিচ চাষে আমির শুধু নিজের দারিদ্র্যতাই দূর করেননি, অনেক কৃষকের আয়ের পথও খুলে দিয়েছেন তিনি।

আমির আলী জানান, ১৯৮৯ সালে তিনি কাজের খোঁজে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলায় যান এবং সেখানে এক আতœীয়ের মরিচ ক্ষেতে দিন মজুরের কাজ করে শিখে আসেন মরিচ চাষের পদ্ধতি। সে বছরেই গ্রামে ফিরে পল্লীমারী চরে নিজের ১৫ শতক জমিতে মরিচ চাষ শুরু করেন। ফলন ভাল হয় এবং লাভ বেশি পাওয়ায় পরের বছর ৫০ শতক জমি ইজারা নিয়ে মরিচ চাষ করেন।

ঐ সময় তিনি ১৫ হাজার টাকা লাভ করেন। সেই থেকে তিনি মরিচ চাষ করে সেই লাভের টাকা দিয়ে এখন ১৬ একর জমির মালিক। আমিরের পথ ধরে কাউনিয়া উপজেলার প্রানণাথ চর,আরাজী হরিশ্বর চর, গদাই চর, পাঞ্চর ভাঙ্গা চর, চর গনাই , ঢুষমারার চর, বিশ্বনাথ চর, হয়বতখাঁ চর, আজমখাঁ চর সহ ২৯ টি চরে মরিচের চাষ করছে কৃষকরা।

এসব কৃষকরা জানান, প্রতিবছর আশ্বিন – কার্তিক মাসে যখন বৃহত্তর রংপুর জুড়ে কাজের অভাব দেখা দেয় তখন কাউনিয়া থাকে কর্মমুখর। কৃষকরা তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে মরিচ ক্ষেতে কাজ করে। উৎপাদিত মরিচ বাজারে নিয়ে আসে বিক্রি করতে। বর্তমানে কাউনিয়ার তকিপল বাজার,টোপমধুপুর হাট,শহীদবাগ হাট এবং ভায়ারহাট রংপুর জেলার বড় কাচা মরিচের মোকাম বলে দাবী করেন মরিচ চাষীরা।

বর্তমানম স্থানীয় বাজারে প্রকার ভেদে প্রতি মন কাচা মরিচের দাম ৮’শ থেকে ১ হাজার টাকা । স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখন এসব মরিচ পাইকারদের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে ঢাকা,কুষ্টিয়া ও যশোর সহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। আর সেই সাথে স্বাবলম্বী হচ্ছেন হাজারও কৃষক।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য