তত্ত্বাবধানে থাকা নারী খেলোয়াড়দের যৌন নির্যাতনের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের জিমন্যাস্টিক দলের সাবেক এক চিকিৎসককে ১৭৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অভিযুক্তদের কান্নার মধ্যে বুধবার মিশিগানের ইংহ্যাম কাউন্টি সার্কিট আদালত চিকিৎসক ল্যারি নেসারের বিরুদ্ধে এ রায় দেয় বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

“আমি তোমার মৃত্যু পরোয়ানায় স্বাক্ষর করলাম,” ৫৪ বছর বয়সী নেসারকে বলেন বিচারক রোজমেরি আকুইলিনা। এসময় উপস্থিত দর্শক ও অভিযুক্তদের চোখে পানি দেখা যায়, তারা করতালি দিয়ে আদালতের রায়কে স্বাগত জানান।

এ সময় গাঢ নীল রংয়ের কয়েদি পোশাক পরা নেসারকে বিব্রত দেখাচ্ছিল। সাবেক এ জিমন্যাস্টিক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে জনসমক্ষে প্রথম অভিযোগ জানানো র‌্যাচেল ডেনহলেন্ডেরকে তখন আনন্দে প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা আঙ্গেলা পভিলাইটিসকে জড়িয়ে ধরতে দেখা যায়।

ডেনহেলেন্ডারসহ প্রায় ১৬০ জনের কাছ থেকে নেসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

নির্যাতন বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতার সমালোচনার মধ্যে রায় ঘোষণার পর মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। নেসার ওই বিশ্ববিদ্যালয়েও কাজ করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অলিম্পিক কমিটির প্রধান জিমন্যাস্টিকের সব পরিচালককে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন।

মামলার শুনানিতে চারটি অলিম্পিকে চিকিৎসকের দায়িত্বে থাকা নেসার তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো নারীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, “আপনাদের কথাগুলো জীবনভর মনে রাখবো আমি।”

বিচারক নেসারের এ বিবৃতিকে ‘কপট’ অ্যাখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখ্যান করেন। আদালতকক্ষে উপস্থিত দর্শকদের বিস্ময়ের মধ্যে বিচারক দোষী সাব্যস্ত জিমন্যাস্টিক চিকিৎসকের একটি চিঠিও পড়ে শোনান, যাতে নিজেকে ভালো চিকিৎসক দাবি করে নেসার তাকে দোষী বানানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন।

শিশু পর্নোগ্রাফির অভিযোগে অন্য একটি মামলায় ইতোমধ্যে ৬০ বছরের কারাদণ্ডে থাকা নেসার চিঠিটিতে বলেন, টাকা ও খ্যাতির জন্য অনেকেই তার বিরুদ্ধে ‘বিকৃত অভিযোগ’ করছে।

“আপনি কি আপনার আবেদন প্রত্যাহার করতে চান,” চিঠি হাতে নিয়ে বলেন বিচারক আকুইলিনা।

জবাবে নেসার আবেদন প্রত্যাহার না করার কথা বলেন।

“কারণ আপনি দোষী। দোষী নন কি? আপনি কি দোষী?,” জিজ্ঞাসা বিচারকের।

দীর্ঘ বিরতির পর নিচুস্বরে নেসার বলেন, “আমি সঠিকভাবেই আমার আবেদন জানিয়েছি।”

গত বছর থেকে মার্কিন বিনোদন জগত ও রাজনৈতিক অঙ্গনে একের পর এক যৌন হয়রানি ও লাঞ্ছনার অভিযোগের মধ্যে বিচারক এবং তদন্ত কর্মকর্তারা এই রায়ের বিস্তৃত গুরুত্বের কথাও উল্লেখ করেন।

“ইতিহাসের এই ক্ষণে এই রায় ও শুনানিকে যৌন হয়রানি বিষয়ে আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র, জাতি ও সংস্কৃতির জন্য দিক পরিবর্তনকারী হিসেবে বিবেচনা করা হবে,” বলেন পভিলাইটিস।

নেসারের বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের মধ্যে অলিম্পিকে স্বর্ণপদকজয়ী অ্যালি রেইজম্যানও আছেন। মার্কিন জাতীয় দলের সাবেক এক খেলোয়াড় বলেছেন, নেসারের নির্যাতন তাকে হতাশা ও খাদ্য গ্রহণের ব্যাধিতে ভুগিয়েছিল।

২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকে সোনা জেতা ম্যাককায়লা মেরনি নেসারকে ‘দানব’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন। আরেক জিমন্যাস্ট বলেছেন, চিকিৎসক নেসার তাকে ছয় বছর বয়স থেকে যৌন নির্যাতন শুরু করে। এই ঘটনা তার বাবাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করেছিল বলেও দাবি ওই জিমন্যাস্টের।

রেইজম্যান ও মেরনি ছাড়াও অলিম্পিকে স্বর্ণপদকজয়ী সিমন বিলস, জর্ডিন উইবার ও গ্যাবি ডগলাস জিমন্যাস্ট দলের সাবেক চিকিৎসক নেসারের বিরুদ্ধে নির্যাতনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনেন।

সাতটি প্রথম মাত্রার যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গত বছরের নভেম্বরে ইংহাম কাউন্টির আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন নেসার। ইটন কাউন্টির আদালতেও তার বিরুদ্ধে এ ধরণের তিনটি অভিযোগে মামলা চলছে। সামনের সপ্তাহে ওই মামলাগুলোরও রায় হওয়ার কথা

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য