বাজেট বাড়ানো নিয়ে সিনেটে উত্থাপিত একটি বিল পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কার্যক্রমে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে।

এর ফলে জরুরিভাবে প্রয়োজনীয় নয় কেন্দ্রীয় সরকারের এমন অনেক কর্মীকে অবৈতনিক ছুটিতে যেতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্ত অনেক দপ্তরও বন্ধ হয়ে যাবে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

তবে জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ চলবে, যার মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা, ডাক, বিমান ওঠা-নামার কাজ, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের সেবা, হাসপাতালে জরুরি বিভাগে সেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কারাগার, কর বিভাগ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন অন্যতম।

কর্মীদের মধ্যে কারা কারা ছুটিতে যাচ্ছেন তা শনিবারই জানা যেতে পারে বলে রয়টার্সের ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে; ২৬ জানুয়ারি থেকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে যাওয়ার আগে এ সপ্তাহেই তারা শেষবারের মতো বেতন পাবেন।

বিবিসি জানায়, আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারের বাজেট বাড়ানো নিয়ে প্রস্তাবিত ওই বিল সিনেটে প্রয়োজনীয় ৬০ ভোট পায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম হোয়াইট হাউজ ও কংগ্রেস একই দলের নিয়ন্ত্রণে থাকার পরও সরকারের বাজেট বাড়ানোর বিল অনুমোদন পেতে ব্যর্থ হল।

এর আগে ২০১৩ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে সিনেটরদের মতবিরোধে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তহবিল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং ১৬ দিন পর্যন্ত ওই অচলাবস্থা চলেছিল।

তখন আট লাখের বেশি কর্মীকে অবৈতনিক ছুটিতে যেতে হয়েছিল; জাতীয় উদ্যান ও স্মৃতিস্তম্ভগুলোর রক্ষণাবেক্ষণেও সমস্যা দেখা দিয়েছিল; যা নিয়ে দেখা দিয়েছিল জনরোষ।

এর আগে এ ধরণের ঘটনায় ছুটিতে যাওয়া কর্মীদের সামান্য ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছিল কংগ্রেস। ট্রাম্প প্রশাসনও একই ধরণের পদক্ষেপ নিতে পারে বলে শুক্রবার জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

এ দফা কতজনকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হবে এবং কোন কোন দপ্তরের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা জানা যায়নি। তবে ২০১৩-র সময়ে এ ধরণের অচলাবস্থায় কি ঘটেছিল তার একটি তুলনা টেনে যা হতে পারে তার একটি ধারণা দিয়েছে রয়টার্স।

সামরিক বাহিনী: সরকারের অচলাবস্থার কারণে আফগানিস্তানে যুদ্ধ এবং ইরাক ও সিরিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী লড়াই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বলে শুক্রবার মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। সামরিক বাহিনীর ১৩ লাখ সদস্য প্রতিদিনকার মতোই দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন। তবে প্রয়োজনীয় নয় সামরিক বাহিনীর এমন কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত বেসামরিকদের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হতে পারে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জিম ম্যাটিস বলেছেন, তহবিল আটকে গেলে রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই যুদ্ধজাহাজগুলো চলতে হবে, বন্ধ থাকবে সামরিক বিমানের উড্ডয়নও।

বিচার বিভাগ: মার্কিন বিচার বিভাগের বেশিরভাগ কর্মীই প্রয়োজনীয়। সরকারি অচলাবস্থা শুরু হলে বিভাগটির এক লাখ ১৫ হাজার কর্মীর মধ্যে ৯৫ হাজারই কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।

আর্থিক নজরদারি: কংগ্রেসে বাজেট ঠিক হলেও স্টক মার্কেটের নিয়ন্ত্রক সিকিউরিটিস অ্যান্ড অ্যাক্সচেঞ্জ কমিশনের অর্থায়ন হয় বিভিন্ন আর্থিক খাত থেকে পাওয়া ফি-র মাধ্যমে। এর আগে সরকারি অচলাবস্থা চলার সময়ও তারা সাময়িকভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়েছিল; তবে মার্কিন কংগ্রেস যদি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেও অচলাবস্থা নিরসন করতে না পারে তাহলে এর কর্মীদের বাধ্যতামূলক অবৈতনিক ছুটিতে যেতে হবে।

হোয়াইট হাউস: শুক্রবার ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, বাজেট নিয়ে অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে হোয়াইট হাউসের এক হাজার ৭১৫ কর্মীর মধ্যে এক হাজারেরও বেশি কর্মীকে ছুটিতে যেতে হবে। তেমনটা হলে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন এবং সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত সফরের সময় তাকে অতিরিক্ত কর্মীসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া লাগতে পারে বলে প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

ন্যাশনাল পার্ক: রেঞ্জার্স এবং নিরাপত্তারক্ষীদের দায়িত্বে রেখেই অচলাবস্থার মধ্যেও ন্যাশনাল পার্কগুলো খোলা রাখার পরিকল্পনা আছে ট্রাম্প প্রশাসনের। ২০১৩ সালের অচলাবস্থায় পার্কগুলো প্রতিদিন সাড়ে সাত লাখ দর্শক হারিয়েছে বলে অলাভজনক ন্যাশনাল পার্ক কনজারভেশন অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, ক্ষতি হয়েছে ৫০ কোটি ডলারের উপরে।

পর্যটন খাত: ওবামা আমলে হওয়া অচলাবস্থায় স্মিথসোনিয়ান জাদুঘরের মতো জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছিল লিংকন মেমরিয়াল, লাইব্রেরি কংগ্রেস ও ন্যাশনাল আর্কাইভস। এ দফা এ ধরণের উন্মুক্ত কেন্দ্রগুলো বন্ধ না রাখার পরিকল্পনা আছে বলে ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

ট্যাক্স: ২০১৩ সালে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগের ৯০ শতাংশ কর্মীকেই বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল বলে লিবারাল সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেস জানিয়েছে। ওই কারণে প্রায় চারশ কোটি ডলার ট্যাক্স জমা হতে দেরি হয়েছিল, ভাষ্য ব্যবস্থাপনা ও বাজেট দপ্তরের।

মেইল ডেলিভারি: দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পরিচালনার অর্থ কর থেকে না আসায় অচলাবস্থাতেও যুক্তরাষ্ট্রের ডাক বিভাগের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

ভ্রমণ: নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা কাজ করায় বিমান ও রেল যোগাযোগে ২০১৩-র অচলাবস্থা তেমন প্রভাব ফেলেনি। খানিকটা ধীরগতির হলেও পাসপোর্ট বিষয়ক কর্মকাণ্ডও স্বাভাবিক ছিল।

আদালত: অতিরিক্ত অর্থ না পেলেও সুপ্রিম কোর্টসহ কেন্দ্রীয় আদালতের তিন সপ্তাহ পর্যন্ত কার্যক্রম চালাতে সমস্যা হবে না বলে ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

স্বাস্থ্যসেবা: ২০১৩ সালে বয়সী ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যবীমার কর্মকাণ্ডও কোনো বাধা ছাড়াই অব্যাহত ছিল। তবে কয়েকশ রোগী ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের ক্লিনিকাল ট্রায়ালে ভর্তি হতে ব্যর্থ হয়েছিল। সেবার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলেও এবার তা হবে না বলে ধারণা প্রশাসনের।

শিশু: পাঁচ বছর আগের অচলাবস্থায় আলাবামা, কানেকটিকাট, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, মিসিসিপি ও সাউথ ক্যারোলাইনার ছয় হাজার তিনশ শিশুর জন্য চালানো একটি কর্মসূচি নয়দিন বন্ধ ছিল।

সামাজিক নিরাপত্তা: সেবার সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রতিবন্ধকতা অনুসন্ধানের কাজও একেবারে বন্ধ ছিল না, বিভিন্ন দপ্তরও খোলা ছিল তবে সেগুলোর কার্যক্রম ছিল সীমিত।

লোন: আয় ও সোশাল সিকিউরিটি নম্বর ভেরিফিকেশনসহ সরকারি বিভিন্ন সেবা পেতে দেরি হওয়ায় বন্ধকী ও অন্যান্য লোন অনুমোদনে্র প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়ে গিয়েছিল।

ভেটেরান: ২০১৩-র অচলাবস্থার সময় ভেটেরান বিষয়ক দপ্তরের বেশিরভাগ কর্মীই কাজ চালানোর সুযোগ পেয়েছেন। ভেটেরানদের জন্য থাকা চিকিৎসাসেবা এবং অন্যান্য সুবিধাদিও অব্যাহত ছিল। যদিও শিক্ষা এবং মামলা সহায়তার কার্যক্রমে ধীরগতি ছিল।

ফুড ইন্সপেকশন: কৃষিবিভাগের মিট ইন্সপেক্টররও কাজে বহাল ছিলেন। তবে কৃষি পরিসংখ্যান বিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশের কাজ স্থগিত ছিল, বিভাগের ওয়েবসাইটও ছিল নিস্ক্রিয়।

জ্বালানি: তহবিল ছাড়ে খুব বেশি দেরি না হলে তাদের কর্মীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। তবে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে ‘স্বল্প সংখ্যক’ কর্মীকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে যাওয়া লাগতে পারে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য