পাকিস্তানে সাত বছর বয়সী শিশু জয়নাব হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। সম্প্রচারমাধ্যম জিও টিভি তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, মঙ্গলবার স্বতপ্রণোদিত বিচার প্রক্রিয়া শেষে সুপ্রিম কোর্ট অসন্তোষ প্রকাশ করে। সর্বোচ্চ আদালত তাদের পর্যবেক্ষেণে জানায়, পাঞ্জাব সরকার ও পুলিশের তদন্তের আশানুরুপ অগ্রগতি হয়নি । তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছে লাহোরেও হাইকোর্টও। এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া শিশু জয়নাবের হত্যাকারীকে গ্রেফতারে নতুন করে আলটিমেটাম দিয়েছে তারা।

গত ৪ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) কোরআন ক্লাসে শেষে বাসায় ফেরার পথে পাঞ্জাবের কাসুর শহর থেকে ছয় বছরের শিশু জয়নাবকে অপহরণ করা হয়। ওই সময় বাবা-মা ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরবে থাকায় খালার কাছে ছিল সে। পরে ৯ জানুয়ারি এক পুলিশ সদস্য শাহবাজ খান রোডে আবর্জনার স্তূপ থেকে জয়নাবের মরদেহ উদ্ধার করেন। ময়না তদন্তে দেখা গেছে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে তাকে।

এক বছরের মধ্যে কাসুরে আরও ১১ টি শিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে। জয়নাবের ঘটনায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ে কাসুর শহরসহ গোটা পাকিস্তান। এরপর মামলার তদন্তের পঞ্চম দিনে সামনে আসে মূল সন্দেহভাজনের দুটি স্পষ্ট ছবি। এছাড়া এই মামলায় আর কোনও বড় অগ্রগতি নেই বলে জানান পাঞ্জাবের পুলিশ প্রধান আরিফ নওয়াজ খান।

মঙ্গলবার পাঞ্জাবের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিচাক (এআইজি) ও অ্যাডভোকেট জেনারেল আদালতে হাজির হয়েছিলেন। তার উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, এখনও মামলায় স্পষ্টত কোনও অগ্রগতি হয়নি। তিনি বলেন, ‘কিছু প্রয়োজন হলে এখানে বলতে পারেন তারা। পুরো দেশ এই ঘটনায় মর্মাহত। অথচ এখন পর্যন্ত কি করা হয়েছে।’ জবাবে অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, মামলাটি নিয়ে তারা তদন্তকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। আর অ্যাডভোকেট জেনারেল বলেন, এখন পর্যন্ত ১১০০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, ‘যদি এই বিষয়টি সমাধান করা না যায় তবে এটা পুলিশ ও সরকারের ব্যর্থতা।’ এআইজি বলেন, কাসুরে গত দেড় বছরে এমন আটটি ঘটনা ঘটেছে। সরকার গ্রেফতারের সময়ই দিতে পারে না।

প্রধান বিচারপতি নিসার বলেন, কোটি কোটি রুপি খরচ করে শহরকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। হত্যাকারীকে গ্রেফতার করতে হবে। এনকাউন্টারে কোনও সন্দেহভাজন নিহত হোক সেটা চান না তিনি। হত্যাকারীকে সিরিয়াল খুনি হিসেবেও উল্লেখ করেছেন তিনি। প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, পার্লামেন্ট সবোর্চচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তাদের অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে। এই বিষয়ে সিনেট রাজা রাব্বানিকে হস্তক্ষেপের অনুরোধ করেন তিনি। বলেন, বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগের বিভেদ দূর করা উচিত। তিনি এ বিষয়ে সংসদ সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতেও প্রস্তুত। শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে যথাযথ আইন প্রণয়নে পার্লামেন্ট ব্যর্থ হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি।

এদিকে এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের খবরে বলা হয়েছে, সোমবার লাহোর হাইকোর্টের প্রথম আল্টিমেটাম শেষ হয়। সেই দিনই পাঞ্জাব পুলিশ প্রধানকে ওই ভয়ানক ঘটনার প্রকৃত অপরাধীকে ধরার জন্য আরও ২৪ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়। প্রধান বিচারপতি মানসুর আলী শাহ’র নেতৃত্বে হাইকোর্টের দুই সদস্যের বেঞ্চ বিশেষ শিশু আদালত গঠনের নির্দেশও দেয়। ওই আদালতে এ ধরনের মামলার বিচারের ক্ষেত্রে বিচারপতিদের অগ্রাধিকারও দিতে বলা হয়। ওই আদালতের মামলাগুলো নির্ধারিত দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে আর এর মধ্যে অন্য কোনও মামলা গ্রহণ করা যাবে না। পূর্ববর্তী শুনানিতে, লাহোর হাইকোর্টের বিচারপতি পাঞ্জাব পুলিশের মহাপরিদর্শককে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে এই জঘন্য অপরাধে জড়িতদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেন।

সোমবার আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, পুলিশের স্বীকার করা উচিত তারা মেয়েটির অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটিতে অবহেলা করেছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আজহার সিদ্দিকী ও শাহীন পীরজাদার করা রিট পিটিশনের কার্যক্রম চলাকালে বিচারপতিদের দুই সদস্যের বেঞ্চ ওই পর্যবেক্ষণ দেয়। বিচারপতি শাহ তার পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘২০১৫ সালের জুনে (কাসুরের শিশু পর্নগ্রাফি মামলায়) অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নিলে জয়নাবের (ধর্ষণ ও হত্যার) ঘটনা ঘটতো না।’

প্রধান বিচারপতি রবিবার যৌথ তদন্ত কমিটিকে তলব করেছেন। ডাকা হয়েছে পাঞ্জাব ফরেনসিক সাইন্স এজেন্সিকেও। ১০ জানুয়ারি সুও মোতুর মাধ্যমে এই মামলা হাতে নেন প্রধান বিচারপতি। ১১ জানুয়ারি পাঞ্জাব পুলিশ প্রতিবেদন পেশ করে। প্রতিবেদনে জয়নাবের অপহরণ ও চলমান তদন্ত নিয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য