আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট থেকেঃ বন্যার ধকল কেটে উঠতে না উঠতেই উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটের তিস্তার চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় গরীবের ঘরে শীতের হানা যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাড়িয়েছে।

প্রতিনিয়ত শীতের তীব্রতা সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে, ঠান্ডাজনিত রোগ দেখা দিয়েছে, যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত, চরের প্রায় শতভাগ মানুষই শীতবস্ত্রহীন, বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে, শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। গত দুই সপ্তাহ ধরে ঘন কুয়াশার পাশাপাশি মৃদু শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকায় শীতে কাঁপছে জেলার কয়েক লাখ মানুষ।

প্রতিনিয়ত শীতের তীব্রতা সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত রোববার ও সোমবার সূর্যের দেখা মেলেনি এ জেলায়। ঘন কুয়াশার কারণে জেলার যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যতই দিন যাচ্ছে ততই শীতের তীব্রতা বাড়ছে। প্রচন্ড শীতের কারণে নিউমোনিয়া, অ্যাজমা, কোল্ড এলার্জি ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন ঠান্ডাজনিত রোগ দেখা দিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে তিস্তা ও ধরলা নদীর চর অঞ্চলের লোকজন। শীতের কারণে বিপাকে পড়েছে দিন মজুর শ্রেণীর লোকজন। শীতের কারণে বাইরে কাজ করতে যেতে না পাওয়ায় তাদের ঘরে খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। অন্য দিকে শীত বস্ত্রের অভাবে কষ্ট করছে। জেলায় বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে না করতেই শীতের তীব্রতা দেখা দেয়ায় যেনো শীত “মরার উপর খরার ঘা” হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লালমনিরহাটের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ৫ দিকে তিস্তা ও ধরলা নদীতে পরিবেস্টিত লালমনিরহাট জেলায় শীত মওসুমে শীতের তীব্রতা অন্য যে কোন জেলার চেয়ে বেশি। বিগত বছরের তুলনায় এবার অনেক আগে থেকেই শীত জেঁকে বসেছে। স্থলভাগের তুলনায এই শীতে চরাঞ্চলগুলোর মানুষের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। জনবসতিপূর্ণ এসব চরের প্রায় শতভাগ মানুষই শীতবস্ত্রহীন।

এসব এলাকার মানুষের শীত নিবারনের অবলম্বন বলতে ধানের খড় কুটোর আগুনের তাপ। শীত নিবারন হয়না বলে চরের ভূমিহীনরা ঘরের দুয়ারে খড়-গোবরের মুঠিয়া জ্বালিয়ে রাখেন সারারাত। রাতে দুই কাঁথায় তাদের শীত কাটে। ছেলেমেয়েদের পরনে গরম কাপড় নেই।

একদিকে অভাব-অনটন, অন্যদিকে শীত বস্ত্রহীন দিনরাত অতিবাহিত করছে এ জেলার নিম্ম আয়ের মানুষ। শিক্ষার্থীরা অনেক কষ্ট করে ঘন কুয়াশায় বিদ্যালয় যাচ্ছে। বিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে। গবাদি পশুকেও প্রচন্ড শীতের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক স্থানে গবাদি পশুর বাচ্চা মরে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

উত্তরবাংলা কলেজের অধ্যক্ষ এএসএম মনওয়ারুল ইসলাম জানান, জেলায় সরকারি ও বেসরকারি ভাবে যে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান মানুষের শীত বস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

জেলার বুড়িমারী স্থল বন্দর সুত্রে জানা গেছে, ওই শুল্ক ষ্টেশন থেকে প্রতিদিন শত শত আমদানীকৃত কমলা, আপেল, আঙুর ও পাথরসহ ভারত থেকে আমদানিকৃত বিভিন্ন পন্যে বহনকারী ট্রাকগুলো পড়েছে আরো দুর্বিপাকে। ঘন কুয়াশার কারনে গন্তব্য যেতে কয়েক ঘন্টা সময় বেশি লাগছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এ দিকে লালমনিরহাট বিভাগীয় রেলওয়ে কন্ট্রোলরুম সূত্রে জানা গেছে, ঘন কুয়াশার কারনে লালমনিরহাট থেকে ছেড়ে যাওয়া ও ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা আন্তনগর ও লোকালসহ সব টেন ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় চলাচল করছে। ঘন কুয়াশার কারণে লালমনি এক্সপ্রেস প্রায় প্রতিদনিই লালমনিরহাট ও কমলাপুর ষ্টেশন থেকে দেরিতে ছাড়ছে। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আগত যাত্রীরা চরম বিপাকে পড়েছে।

লালমনিরহাট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে সহকারী কমিশনার সুজাউদ্দৌলা জানান, জেলার ৪৫ টি ইউনিয়ন ও ২ টি পৌরসভায় শীত বস্ত্র হিসাবে এ পর্যন্ত ৩২ হাজার কম্বল বিতরণ করা হচ্ছে। আরো কিছু শীত বস্ত্র এসেছে তা বিতরণ চলছে। লালমনিরহাট সিভিল সার্জন ডাঃ কাসেম আলী জানান, কয়েক দিন ধরে শীতের প্রকোপ দেখা দেয়ায় ঠান্ডা জনিত রোগ দেখা দিয়েছে। আমরা সকলকে সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করার পরামর্শ দিচ্ছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য