আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট থেকেঃ লালমনিরহাটের তিস্তা ও ধরলা নদীর বন্যার ভয়াবহতা থেকে জেলার ৫টি উপজেলাকে রক্ষা করতে বিভিন্ন স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্মাণ করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। এ বছরের বন্যায় অধিকাংশ বাঁধ ও সড়ক ভেঙে গেছে। সংস্কারের অভাবে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে সেই বাঁধ ও সড়কগুলো। দ্রুত সংস্কার না হলে আগামী বন্যায় জেলায় আরো বেশি ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তিস্তা ও ধরলা তীরবর্তী লোকজন। বর্ষা আসতে বেশ কয়েক মাস বাকি থাকতেই এই শীতকালেও তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন আগামী বন্যা নিয়ে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা নদীর বন্যা থেকে লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলাকে রক্ষা করতে তিস্তা ব্যারাজ থেকে ভাটিকে প্রায় ১কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ওই বাঁধের বিভিন্ন অংশ এ বছরের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে জেলার কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও জেলা সদর রক্ষা করতে ২০০৩ সালে তিস্তার বাম তীরে ২৬ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও দুটি সলেডি স্পার বাঁধ নির্মাণ করা হয়।

নির্মাণকালীন ৭০ ফুট প্রস্থ জমি অধিগ্রহণ করে ১৪ ফুট প্রস্থ টপ ও ৭-১০ ফুট উচু এ বাঁধ নির্মাণ করা হয়। যার মধ্যে সলেডি স্পার-২ থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় এক কিলোমিটার কাজ না করেই সমাপ্ত করা হয়। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ওই বাঁধ কেটে নিয়ে আবারো ফসলি জমি, পুকুর ডোবাসহ বসতবাড়ি নির্মাণ করছেন জমির মালিকরা। ফলে ৭০ ফুটের এ বাঁধ এখন কোথাও কোথাও ৪-৫ ফুটে পরিণত হয়েছে।

গত বন্যায় বেশ কিছু অংশে প্রবাহিত হয় বন্যার পানি। কোনো কোনো স্থানে স্থানীয়রাই জিও ব্যাগ দিয়ে বাঁধ রক্ষা করেছেন মাত্র। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর তা সংস্কারের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সলেডি স্পার বাঁধের দুই পাশে বসতবাড়ি করছেন আগের মালিকরা। আর পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ জমি দখল নিয়েও প্রায়ই বিবাদ বাধছে স্থানীয়দের মাঝে।

বাঁধের এ জমি উদ্ধার করে দ্রুত সংস্কার করা না হলে আগামী বন্যায় উপজেলা সদরসহ জেলা শহরও বন্যার নদী ভাঙনের মুখে পড়বে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা। বেদখলে যাওয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের জমি ফিরিয়ে দিতে দখলকারীদের নামে একাধিক বার নোটিশ করা হয়েছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড দাবি করলেও দখলকারীরা তা অস্বীকার করেছেন। আগামী বন্যায় এ বাঁধটি রক্ষা নিয়েও চিন্তিত খোদ পানি উন্নয়ন বোর্ড।

তিস্তা সড়ক সেতু থেকে কালীগঞ্জের কাকিনা রেলগেট পর্যন্ত বাঁধের অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের রজবপাড়া, কুটিরপাড়, চন্ডিমারী এবং সদর উপজেলার কালমাটি আনন্দ বাজার, বাগডোরা অংশে।

এদিকে ধরলার ডান তীর রক্ষায় সাড়ে ১৮ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়। যার মধ্যে গত বন্যায় ৩৫টি স্থানে এক দশমিক তিন কিলোমিটার পুর্ণাঙ্গ এবং প্রায় ৫ কিলোমিটার আংশিক ভেঙে যায়। এ বাঁধ সংস্কারের জন্য ৩৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে একটি প্রকল্প পাঠিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সরকারি তথ্য মতে, গত বন্যায় জেলায় প্রায় আটশ’ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলার এসব বাঁধ আগাম সংস্কার না হলে আগামী বন্যায় দ্বিগুণ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সুশীল সমাজ ও নদী পাড়ের মানুষজন।

লালমনিরহাট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার সুজাউদ্দৌলা নতুন সময় প্রতিনিধি কে জানান, বন্যায় জেলার ব্যাপক রাস্তা ও অস্থায়ী বাঁধের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেগুলো মেরামত প্রয়োজন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।

লালমনিরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম জাকিরুল রহমান বলেন, ‘এ বছর বন্যায় লালমনিরহাট জেলায় প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্থ সড়কগুলো মেরামতের জন্য চেষ্টা করছি।’
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভাগীয় উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ধরলা ডান তীর সংস্কারের জন্য বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিস্তা বাম তীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের জমি বেদখল হওয়ায় ভাঙনের মুখে পড়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য