আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট থেকে: বাহে ‘কাম (কাজ) না করলে তো প্যাটোত (পেটে) ভাত যায় না। কঠিন ঠাণ্ডায় সারা দিন থরথর করি গাও কাঁপে। ইয়াতে কতক্ষণ কাম করা যায়!’ এ ভাবে কথাগুলো বলছিলেন, লালমনিরহাট হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী ইউনিয়নের তিস্তা পারের দোয়ানী গ্রামের দিনমজুর কাদের মিয়া (৪৭)।

শুধু তিনিই নন, ঘন কুয়াশাসহ তীব্র শীত জেঁকে বসায় এ জেলার সর্বত্র শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে কৃষি শ্রমিকরা পড়েছে বেকায়দায়। কনকনে হাওয়া ও শৈত্যপ্রবাহে চার দিন ধরে তীব্র শীত জেঁকে বসেছে উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটে ।

সকাল থেকে সারা দিন প্রকৃতি ঢাকা থাকছে ঘন কুয়াশার চাদরে। সরেজমিন রোববার (৭জানুয়ারি) বিকেলে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার সাধুর বাজার,নিজ গড্ডিমারী, তালেবমোড়, দোয়ানী, ছয়আনী, এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, ওই এলাকার খেটে খাওয়া মানুষ কাজকর্ম না পেয়ে খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারনের চেষ্টা করছেন।

কয়েক দিনের টানা শৈত্য প্রবাহে তিস্তা পারের হতদরিদ্র মানুষের ভোগান্তি চরমে উঠেছে। রোববার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সূর্যের মুখ দেখা যায় নি। লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী এলাকার খেটে খাওয়া মানুষ কাজ কর্ম না পেয়ে পরিবারপরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। তিস্তা পারের জনজীবন বিপর্ষস্ত হয়ে পড়েছে।

ঘন কুয়াশার পাশাপাশি তীব্র শীতে ঘর থেকে বের হতে পারচ্ছে না তিস্তা পারের মানুষজন। খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারনের চেষ্টা তারা। এই শীতে সবচেয়ে বেশী কষ্টে আছেন বৃদ্ধ ও কোমলমতি শিশুরা। রেল স্টেশনসহ জেলার বিভিন্নস্থানে অবস্থানকারী ছিন্নমুল মানুষগুলো শীতবস্ত্রের অভাবে কষ্ট পোহাতে হচ্ছে। শীতার্ত মানুষগুলো এক টুকরো গরম কাপড়ের জন্য তাকিয়ে আছেন বিত্তবান লোকদের দিকে।

সন্ধ্যার পরপরই শহর ও গ্রামের হাটবাজারের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। তীব্র শীতের কারণে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, সর্দি-জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। আক্রান্তরা চিকিৎসা নিতে ভিড় করছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে।

গড্ডিমারী ইউনিয়নের তালেব মোড় এলাকার ভ্যান চালক, হোসেন আলী বলেন, সারাদিন যা আয় হয় তা দিয়ে ৭ সদস্যের সংসার চালাতেই শেষ। তীব্র শীতে কষ্ট পেলেও শীতের কাপড় কেনার টাকা নেই। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের আমেনা বেগম বলেন, ‘এক দিন না খ্যায়া থাকা যায়, তাও শীতের কষ্ট সহ্য হয় না। ঠাণ্ডার কামড়ে এবার বুজি হামার জান (জীবন) বাঁচে না। ’

লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ী এলাকার কৃষক আমছার আলী জানান, ঠাণ্ডা ও বাতাসের কারণে মাঠে কৃষি কাজ করা যাচ্ছে না। হাতীবান্ধা উপজেলা গড্ডিমারী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান জানান, তিস্তা পারের বেশী ভাগ মানুষ এই শীতে কষ্টে আছেন। দরিদ্র পরিবার গুলোর জন্য শীতবস্ত্র চেয়ে উপজেলা পর্যায়ে আবেদন করেছি।

লালমনিরহাট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে সহকারী কমিশনার সুজাউদ্দৌলা জানান, জেলার ৪৫টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভায় শীতবস্ত্র হিসেবে এ পর্যন্ত ৩২ হাজার কম্বল বিতরণ করা হচ্ছে। দু’একদিনের মধ্যে আরো বরাদ্দ আসবে। রংপুর আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, রোববার সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য