মিয়ানমারের বেসামরিক প্রেসিডেন্ট দেশটির সেনাবাহিনীর রচিত সংবিধান সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের স্বাধীনতা দিবসে দেওয়া ভাষণে এই আহ্বান জানান তিন কিয়াউ। তিনি কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থায় স্বীকৃতি সব সংখ্যালঘুদের জন্য ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান। যদিও তিনি রাখাইনে দেশটির সামরিক বাহিনীর নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অবস্থার কথা ভাষণে উল্লেখ করেননি।

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট

মিয়ানমারের শাসন ব্যবস্থায় সেনাবাহিনীর ভূমিকা কমিয়ে আনার বিষয়টি বেশ স্পর্শকাতর ইস্যু। বেসামরিক সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই এ বির্তক শুরু হয়। যদিও দেশটির ডি ফ্যাক্টো নেত্রী অং সান সু চির উপদেষ্টা ও বিখ্যাত আইনজীবী গত বছরের জানুয়ারিতে নিহত হওয়ার এই বিতর্কে ভাটা পড়ে।

ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের ৭০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট বলেন, আমরা যখন কেন্দ্রীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গড়ে তুলছি রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে। আমাদের সবাইকে উপযুক্ত সংবিধান গঠনের জন্য কাজ করতে হবে।

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের পদ আনুষ্ঠানিক। কিন্তু বর্তমান প্রেসিডেন্ট দেশটির নেত্রী সু চির ঘনিষ্ট। ভাষণে তিনি উপযুক্ত বলতে কী বোঝাতে চাইছেন সে ব্যাখ্যা দেননি। অথবা ২০০৮ সালে সেনারচিত সংবিধানের কথাও যে তিনি বলছেন তা উল্লেখ করেননি।

মিয়ানমারের বর্তমান সংবিধান অনুসারে সু চি প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। বিদেশিকে বিয়ে করা কেউ দেশটির প্রেসিডেন্ট হতে পারেন না বর্তমান সংবিধানের নিয়মে। সু চির প্রয়াত স্বামী ছিলেন একজন ব্রিটিশ নাগরিক। তার দুই সন্তানও ব্রিটিশ।

২০০৮ সালের সংবিধানে সংসদের এক-চতুর্থাংশ আসন সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। এছাড়া বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। এছাড়া সংবিধান সংশোধন ও নিরাপত্তা বিষয়ে সরকারি পদক্ষেপে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে সেনাবাহিনীর।

২০১১ সালে মিয়ানমারের ৪৯ বছরের সেনা শাসনের অবসান হয়। সু চির পার্টি ২০১৫ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করে বেসামরিক সরকার গঠন করে। তবে দেশটির গণতন্ত্রের অভিমুখে এগিয়ে যাওয়া নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে সহিংসতা জোরালো হওয়ার পর হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ছয় লাখেরও বেশি মানুষ। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এ ঘটনায় খুঁজে পেয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এই ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ‘পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ আখ্যা দিয়েছে। রাখাইন সহিংসতাকে জাতিগত নিধন আখ্যা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। এছাড়া দেশটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার হস্তক্ষেপ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ভাষণে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর কথা বললেও রোহিঙ্গাদের পালিয়ে যাওয়া নিয়ে কিছু বলেননি। এমনকি এ ঘটনায় যে আন্তর্জাতিক সমালোচনা হচ্ছে সে বিষয়েও কিছু উল্লেখ করেননি। তিনি বলেন, সবগুলো জাতীয় জাতিস্বত্ত্বাগুলোর জন্য মুক্তি, ন্যায়বিচার, সমতা ও জাতিগত আন্তনিয়ন্ত্রণের নীতির ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

‘জাতীয় জাতিস্বত্ত্বা’ বলতে মিয়ানমার রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি জাতিগুলোকেই ইঙ্গিত করে। রোহিঙ্গারা কয়েক প্রজন্ম ধরে রাখাইনে বাস করলেও দেশটি তাদের জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তারা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত করে।

রাখাইন ছাড়াও দেশটির কাচিন ও শান প্রদেশে গত কয়েক সপ্তাহে নতুন সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। সূত্র: রয়টার্স

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য