আরিফ উদ্দিন, গাইবান্ধা থেকেঃ গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের আলোচিত চার সাংসদ গোলাম মোস্তফা আহমেদ, মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন, কর্ণেল ডা: আব্দুল কাদের খান এবং আবু সালেহ আব্দুল আজিজ গোটা দেশবাসিসহ সুন্দরগঞ্জ উপজেলাবাসিকে হতবাক করে তুলেছেন। এদের মধ্যে দুইজন চলে গেছেন না ফেরার দেশে আর দুইজন এখন বিচারের কাটগড়ায়।

উপজেলার সর্বস্তরের জনগণের মাঝে এখন আলোচিত চার সাংসদকে নিয়ে চলছে আলোচনা এবং পর্যালোচনা। একজন সাংসদ যখন নিরাপদ সড়কের অভাবে দূর্ঘটনার কবলে পড়ে প্রাণ দিতে তখন সাধারণ মানুষের অবস্থা কি হতে পারে সে ভাবনা এখন সকলকে নাড়া দিয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মাঝে আন্দোলিত হচ্ছে চার সাংসদের বিভিন্ন কর্মকান্ড।

গোলাম মোস্তফা আহমেদ: চলতি বছরের ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত সংসদ উপ-নিবাচনে প্রবীণ রাজনীতিবিদ বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সুন্দরগঞ্জ উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা আহমেদ জাতীয় পাটির উপজেলা সভাপতি ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে পরাজিত করে প্রথম বারের মত এমপি নিবাচিত হন। ১০ এপ্রিল শপথ গ্রহণের পর সবেমাত্র বিভিন্ন কর্মকান্ড শুরু করেছেন তিনি।

ইতিমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে রাস্তা পাকাকরণ, পুনঃ মেরামত, কালভাট, সেতু এবং ব্রিজের উদ্বোধন করেছিলেন এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ। রাজনীতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনে এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ চন্ডিপুর আলহাজ্ব তহুরন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১১ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তিনি চন্ডিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

চেয়ারম্যান চলাকালিন সময়ে চলতি বছরের ২২ মার্চ সংসদ উপ-নির্বাচনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পেয়ে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। গত ১৮ নভেম্বর দুপুরে জাতীয় সংসদে যোগ দেয়ার জন্য বাড়ী হতে ঢাকা যাওয়ার পথে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের লাঠিয়ার পাড়া নামক স্থানে সড়ক দূর্ঘটনায় এমপি গোলাম মোস্তফাসহ ৪ জন গুরুতর আহত হয়। স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের উদ্ধার করে টাঙ্গাইল সদর হাসপাতালে ভর্তি করায়।

এমপি গোলাম মোস্তফার অবস্থা আশঙ্খাজনক হওয়ায় তাঁকে ঢাকা সিএম এইচে নেয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় দীর্ঘ এক মাস এক দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ১৯ ডিসেম্বর সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আলোচিত এই সড়ক দূর্ঘটনায় একই গাড়ীতে ড্রাইভারসহ অপর দুই সফর সঙ্গী প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু না ফেরার দেশে চলে গেলেন এমপি মোস্তফা আহমেদ। ১৯ ডিসেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে ৯টায় চন্ডিপুর ইউনিয়নের ফারাজীপাড়া গ্রামের পারিবারিক কবর স্থানে তাকে দাফন করা হয়।

মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন: ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন এমপি নিবাচিত হন। শপথ গ্রহনের পর শুরু করেন বিভিন্ন কর্মকান্ড। এক পর্যায় ২০১৫ সালের ২ অক্টোম্বর উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের গোপাল চরণ গ্রামের সাজু মিয়ার ছেলে শিশু সাহাদত হোসেন সৌরভকে গুলি করে বিশ্বব্যাপি ঝড় তোলেন প্রয়াত এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। এমপি

লিটনের আলোচিত এহেন কর্মকান্ড চলতে থাকলে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের উত্তর সাহাবাজ গ্রামের মাস্টারপাড়াস্থ নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান তিনি। ১ জানুয়ারি হেলিকাপ্টার যোগে তাকে নেয়া হয় সংসদ ভবনে। সেখানে নামাযে জানাযা শেষে পূর্ণরায় হেলিকাপ্টার যোগে তাকে নিয়ে আসা হয় সুন্দরগঞ্জ উপজেলার নিজ বাড়িতে। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা তাকে।

এমপি লিটন হত্যা মামলায় সুন্দরগঞ্জ উপজেলাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে হত্যার সন্দেহে গ্রেফতার করা হয় ৮৭ জনকে। অবশেষে ধরা পড়েন মুল ঘাতক এবং পরিকল্পনাকারী অপর সংসদ সদস্য কর্ণেল ডাঃ আব্দুল কাদের খান। এমপি লিটনের মৃত্যু এবং তার বিভিন্ন কর্মকান্ড গোটা দেশ ব্যাপি আন্দোলিত করে তুলেছিল। এমপি লিটন ছিলেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের নতুন ধারার এক রাজনীতিবিদ। উপজেলা আওয়ামীলীগকে সুসংগঠিত করে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তিকে দমন করেছিলেন এই নেতা।

কর্ণেল ডাঃ আব্দুল কাদের খানঃ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের জাপা (এরশাদ) নেতা কর্ণেল (অব.) ডাঃ আব্দুল কাদের খান এমপি নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে দলীয় নেতা কর্মীদের সঙ্গে সঙ্গ না দিয়ে একাই কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছিলেন তিনি। তার রাজনীতির জীবন ছিল একাকীত্ব। উপজেলা জাতীয় পাটির নেতা হিসেবে তিনি ছিলেন উড়ে এসে জুড়ে বসার মতো একজন প্রার্থী।

দলীয় হাই কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে জাতীয় পাটি হতে মনোনয়ন নিয়ে এসে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। আবার এমপি হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। সে লক্ষ্যে র্দীঘদিনের পরিকল্পনা মোতাবেক ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে কিলার দিয়ে গুলি করে প্রয়াত এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। এমপি লিটন হত্যা মামলার ২৮ দিন পর প্রকৃত খুনের রহস্য বেরিয়ে আসে।

সে মোতাবেক পুলিশ ১৯ ফেব্র“য়ারি এমপি কর্ণেল ডাঃ আব্দুল কাদের খানকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। কাদের খানের দেয়া স্বীকার উক্তি মোতাবেক এমপি লিটনকে খুন করেছিল তারেই ভাড়াটিয়া কিলারা। বর্তমানে কর্ণেল ডাঃ আব্দুল কাদের খান গাইবান্ধা জেলা হাজতে রয়েছেন। ক্ষমতার লোভে কাদের খানের এহেন আলোচিত কর্মকান্ড বিশ্ব ব্যাপি ঝড় তুলেছিল।

আবু সালে মোঃ আব্দুল আজিজঃ ২০০১ সালে ১ অক্টোবর সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪ দলীয় জোটের শরিক দলের জামায়াত নেতা আবু সালেহ আব্দুল আজিজ মিয়া এমপি নির্বাচিত হন। জাতীয় পার্টির ঘাটিকে মাটিতে পরিণত করে দিয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তার আমলে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রাজনীতিতে শুরু হয় নতুন মেরুকরণ। কিন্তু বিধিবাম। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতার আসার পর শুরু হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য।

সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে উপজেলার পাঁচগাছী শান্তিরাম গ্রামের আনিসুর রহমান ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার পিতা ইউপি সদস্য আকবার আলীকে হত্যার অভিযোগ নিয়ে এসে এমপি আব্দুল আজিজসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। কয়েক দফা তদন্তের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইবুন্যাল আব্দুল আজিজসহ ৬ জনকে অভিযুক্ত করে ট্র্যাইবুন্যালে বিচার কার্য শুরু করে। চলতি বছরের ২২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইবুন্যাল আব্দুল আজিজসহ ৬ জনের ফাঁসির আদেশ দেয়। সে মামলায় ২০১৩ সাল থেকে পলাতক রয়েছেন আব্দুল আজিজ। আব্দুল আজিজের এহেন কর্মকান্ড দেশসহ বিশ্বব্যাপি আলোচিত হয়ে উঠেছে।

আলোচিত চার সংসদ সদস্যের কর্মকান্ড সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রাজনীতি অঙ্গে পরবর্তী চলার পথকে কতটুকু সুগম করবে তার নিয়ে জনমনে ভাবনার শেষ নেই।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য