মালিশ করতে তেল ভালো হলেও খাওয়ার জন্য ঘি সেরা। আর এই কারণেই হয়ত প্রাচীন প্রবাদের জন্ম ‘ঋণ করে হলেও ঘি খাও’। শুধু এই উপমহাদেশে নয় বর্তমানে ঘিয়ের কদর সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। হয়ত প্রবাদ পরিবর্তিত হয়ে হবে ‘দরকার হলে ক্রেডিট কার্ড দিয়েও ঘি কিনো!’ কেনো ঘিয়ের এত কদর? উপকারিতাই বা কী? মাখনের চাইতে কি ঘি বেশি ভালো?

কল্যাণকর বলেই হয়ত এখন পশ্চিমাদেশেও ঘি দিয়ে স্পা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে অবস্থিত এরকমই একটি প্রতিষ্ঠান ‘ফোর মুন স্পা’। সুখী ও ভালো থাকার জন্য তারা বিভিন্ন কার্যক্রম করেন।

এই প্রতিষ্ঠানের ডা. অ্যামি চ্যাডউিইক সম্প্রতি স্বাস্থবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঘিয়ের নানান উপকারী দিক তুলে ধরেন।

প্রদাহরোধী: স্বাস্থ্যকর ও নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের জন্য চাই স্বাস্থ্যকর চর্বি। ঘাস খেয়ে বেড়ে ওঠা গাভীর দুধ থেকে তৈরি ঘিয়ে মেলে ওমেগা থ্রি ও ওমেগা সিক্স ফ্যাট বা চর্বি। ছোট ও মাঝারি ‘চেইন’য়ের এ্ চর্বি প্রদাহের মাত্রা মৃদু করতে সাহায্য করে। কারণ এই চর্বি দ্রুত ভাঙে এবং হজম হয় সহজে। ফলে হজম প্রক্রিয়া, গলব্লাডার ও কোষের স্বাভাবিক কার‌্যাবলী বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

অ্যালার্জি কমায়: ‘ল্যাকটোজ ইনটোলেরেন্ট’ বা দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারের যাদের পেটের গড়বড় হয় তাদের জন্য আদর্শ খাবার হতে পারে ঘি।

চ্যাডউইক বলেন, “মাখনকে ১০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় গরম করে ঘি তৈরি হয়, ফলে এই সকল আমিষ উপাদান পাত্রে থেকে যায়, শুধু চর্বি অংশটুকু অবশিষ্ট থাকে ঘিতে। আর এই আমিষ অংশটিই পেটের গড়বড়ের জন্য দায়ী।”

“মাখনে থাকে ‘ক্যাসেইন’ ও ‘ল্যাকটোজ’, যা অনেকেরই হজম করতে সমস্যা হয়, অ্যালার্জি দেখা দেয়। মাখন থেকে এই উপাদানগুলো বের করে দিয়ে ঘি তৈরি করলে চর্বি ও পুষ্টিগুনগুলো পাওয়া সম্ভব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই। তবে আপনার ঘি সহ্য হয় কি না সেটা আগে নিশ্চিত হতে হবে।” -বলেন চ্যাডউইক।

ভিটামিনের উৎস: বিশেষজ্ঞের মতে, “প্রাকৃতিকভাবেই ঘিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, লাইনোলেইক অ্যাসিড ও বিউটাইরিক অ্যাসিড থাকে। দৃষ্টিশক্তি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, জননাঙ্গ ইত্যাদির জন্য ভিটামিন ‘এ’ অত্যন্ত উপকারী।

ঘিতে সামান্য পরিমাণ ভিটামিন ‘কে’, ‘ই’ এবং ‘বি টুয়েলভ’ থাকে।

ঘিয়ের ভিটামিন ‘এ’ এবং ‘কে’ চর্বিতে দ্রবণীয়। ফলে চর্বিজাতীয় খাবারের সঙ্গে খেলে শরীরে আরও ভালোভাবে শোষিত হয়। শরীরের প্রয়োজনে ব্যবহৃতও হয় বেশি কার্যকরভাবে।”

অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান: কোষকে ‘অক্সিডেটিভ’ ক্ষতির হাত থেকে বাঁচায় অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। অক্সিজেনের সঙ্গে পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে কোষের যে ক্ষয় হয় তাই হচ্ছে ‘অক্সিডেটিভ’ ক্ষতি। শরীরে চিনি বেশি হলে, বিপাকীয় চাপ বেশি হলে, কোষের মাইটোকন্ড্রিয়া ভালোভাবে কাজ না করলে এবং ইনসুলিনের অনিয়ম হলে এই সমস্যা হয়। অতিরিক্ত অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে ক্যান্সার ও শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর এই সমস্যার ঝুঁকি কমাতে কিছুটা হলেও অবদান আছে ঘিয়ের।

হাড়ের গঠন: “ঘিয়ের ভিটামিন ‘কে’ ক্যালসিয়ামের সঙ্গে মিলে হাড়ের স্বাস্থ্য ও গঠন বজায় রাখে। স্বাস্থ্যকর ইনসুলিন ও শর্করার মাত্রা বজায় রাখতে কাজে লাগে ভিটামিন ‘কে।” বলেন চ্যাডউইক।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্গানিক ভ্যালির রেজিস্টার্ড পুষ্টিবিদ এবং ফুড স্লুথ রেডিও অর্গানিক’য়ের উপস্থাপিকা মেলিন্ডা হেমেলগার্ন পুষ্টিবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে জানান, “শতভাগ তৃণভোজী গাভীর দুধ থেকে তৈরি ঘি থেকে মেলে সিএলএ (কনজুগেইটেড লাইনোলেইক অ্যাসিড) নামক চর্বি এবং উচ্চমাত্রার ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের গুণাগুন।”

এসম্পর্কে ডা. চ্যাডউইক বলেন, “গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ ও পশু উভয়ের শরীরেই কনজুগেইটেড লাইনোলেইক অ্যাসিড ‘অ্যাডিপস’ অর্থাৎ ‘ফ্যাট টিস্যু’ কমায়, হাড়ের স্বাস্থ্যকর গঠন তৈরিতে সহায়তা করে, হজমে সাহায্য করে, কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। তাই খাদ্যাভ্যাসে এরমধ্যে মাখনের চাইতে ঘি যোগ করাই আদর্শ।”
ছবি: মেঘলা’স কিচেন’য়ের সৌজন্যে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য