জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বীকৃতির ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই যিশুর জন্মস্থান ফিলিস্তিনের বেথেলহেম চার্চ এলাকায় জ্বলতে থাকা ক্রিসমাস ট্রি গুলোর আলো নিভিয়ে ফেলে ।

মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদি এবং খ্রিস্টানদেরও পবিত্র ভূমি হিসেবে পরিচিত জেরুজালেমকে কেবল ইসরায়েলের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত মানতে না পেরে প্রতিবাদ জানাতে এই পথ বেছে নেন তারা।

জেরুজালেমকে ইহুদি রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে ট্রাম্পের স্বীকৃতি এবং তার প্রতিবাদে বিশ্বব্যাপী বিক্ষোভ করছে মুসলমানরা, কিন্তু ফিলিস্তিনের সংখ্যালঘু খ্রিস্টানরাও যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তে নাখোশ, তা এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ফিলিস্তিনের খ্রিস্টধর্ম অনুসারীরা বলছেন, জেরুজালেমে তিন ধর্মেরই চমৎকার সহাবস্থান ছিল, রাজনীতিকরাই এতে বিভক্তি ছড়িয়েছেন।

“আমরা একতাবদ্ধ, খ্রিস্টান-মুসলমান আমরা (ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে) এক,” বলেন রোববারের প্রার্থনা শেষে জেরুজালেমের অ্যাসিরিয়ান চার্চ থেকে বেরিয়ে আসা ফ্রেডরিক হাজো।

পুরনো শহরের কেন্দ্রে ধর্মীয় সামগ্রী বিক্রি করছে এমন দোকানগুলোর মাঝে সরু একটি গলিতে দাঁড়িয়ে ৫৯ বছর বয়সী এ সুরকার বলছেন, ট্রাম্প তার স্বীকৃতির মাধ্যমে ‘পুরো বিশ্বকে সমস্যার গাড্ডায়’ ফেলেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সিদ্ধান্ত বদলেরও আহ্বান জানান তিনি।

রাজনীতি নিয়ে হতাশ হলেও হাজো আত্মবিশ্বাসী, তিন ধর্মের ‘চমৎকার ভারসাম্য’ জেরুজালেমকে ঠিকই ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবে।

“পবিত্র এই স্থানে ঈশ্বর আমাদের সবাইকে রক্ষা করছেন। জেরুজালেমে আমারা তার (ঈশ্বর) দেবদূতদের দ্বারা সুরক্ষিত,” বলেন তিনি।

খ্রিস্ট অনুসারীরা গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশেরও কম, তবুও আঞ্চলিক এবং জাতীয় রাজনীতিতে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে বলে রয়টার্সর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ইসরায়েলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে এর আগেও ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানদের প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে। জুলাইতে আল আকসা মসজিদের কাছে ইসরায়েলি বাহিনী নতুন নিরাপত্তা সরঞ্জাম বসানোর পর মুসলমানদের সঙ্গে হাজোও প্রতিবাদ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন।

ইসরায়েলি নাগরিক কিন্তু আরব, এমন দুই বন্দুকধারীর গুলিতে দু্ই ইসরায়েলি পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার পর ওই মসজিদের কাছে মেটাল ডিটেক্টর বসানোর উদ্যোগ নিয়েছিল ইসরায়েল; তা নিয়েই বাধে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।

নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর সংঘর্ষের অবসান ঘটে; এরপর থেকে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও ট্রাম্পের স্বীকৃতির পর তা আবার অশান্ত হয়ে ওঠে।

ট্রাম্পের স্বীকৃতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস এর বিরোধীতা করে জেরুজালেমের স্থিতাবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।

বিশপের আওতাধীন মার্কিন গির্জাগুলোও প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানায়।

এক বিবৃতিতে তারা বলে, “এই স্বীকৃতি শান্তি প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যতের দ্বি-রাষ্ট্রীক সমাধানের ক্ষেত্রে ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে।”

কিন্তু এর উল্টোচিত্র দেখা গেছে মার্কিন প্রোটেস্টান্টদের মধ্যে। ট্রাম্পের সমর্থক হিসেবে পরিচিত খ্রিস্টানদের এই অংশ জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায় বেশ খুশি।

তারা বলছেন, আধুনিক কালে ইহুদিদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনে ঈশ্বরের যে হাত থাকবে, তা বাইবেলেই বর্ণিত।

নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকেই প্রটেস্টান্টদের একটি প্রভাবশালী অংশের ঘেরাটোপে ছিলেন ট্রাম্প; নির্বাচনেও তিনি শ্বেতাঙ্গ প্রটেস্টান্টদের একচেটিয়া ভোট পেয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। সোমবার খ্রিস্টানদের এই অংশের একটি প্রতিনিধিদল ট্রাম্পের সঙ্গে দেখাও করেছেন।

“আমরা বাইবেলে বিশ্বাসী, আমরা বিশ্বাস করি রাজা ডেভিডের আমল থেকেই জেরুজালেম ইসরায়েলের প্রাচীন রাজধানী। এ কারণেই প্রেসিডেন্টের এই অবস্থান ও সিদ্ধান্ত আমাদের গর্বিত ও সম্মানিত করেছে” বলেন ডালাসভিত্তিক একটি প্রটেস্টান্ট গোষ্ঠীর অনুসারী মাইক ইভানস।

ট্রাম্পও বলছেন, এতদিন ধরে জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা শান্তি প্রক্রিয়াকে অগ্রসর করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ায় ভূমিকা রাখবে বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

ফিলিস্তিনের একটি সুপারমার্কেটের হিসাবরক্ষক মোহাম্মদ আল হাওয়া বলছেন, স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের কথা ও যুক্তিতে বাস্তব পরিস্থিতির জটিলতাকে আমলে নেওয়া হয়নি।

“খ্রিস্টান, ইহুদি ও মুসলিমরা এই শহরে একসঙ্গে বসবাস করে আসছে, রাজনীতি ছাড়া তাদের মধ্যে আর কোনো বিষয়ে সমস্যা নেই, সরকারগুলোই আমাদের মধ্যে যুদ্ধ চায়,” বলেন তিনি।

জেরুজালেম চার্চের চত্বরে যিশুর সমাধিক্ষেত্রের কাছে জড়ো হওয়া অনুসারীদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া একজনের কণ্ঠেও একই সুর।

খ্রিস্টানদের কাছে খুবই পবিত্র হিসেবে পরিচিত জেরুজালেম চার্চটি আল-আকসা মসজিদের কম্পাউন্ড ও ইহুদিদের কাছে পবিত্র ‘ওয়েস্টার্ন ওয়াল’ লাগোয়া; তিন ধর্মের এই তীর্থকেন্দ্রগুলো তাদের অনুসারীদের মতোই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরেই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।

“এটা আমার শহর, আমার রক্ত, আমার জীবন,” বলেন ৭০ বছর বয়সী ওই ফিলিস্তিনি বৃদ্ধ, নিজেকে যিনি ‘জেরুজালেমের অনুসারী’ হিসেবেই পরিচয় দিয়েছেন।

“আমি জেরুজালেমের যে কোনো গির্জায় যেতে পারি, ট্রাম্প কিংবা নেতানিয়াহু কেউই আমাকে বাধা দিতে পারবে না,” বলেন তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য