মাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর থেকেঃ ১৩ ডিসেম্বর। আজকের এই দিনটিকে জেলার বিরল উপজেলার বহলা ট্রাজেডী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এই দিনে পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে ৪৪জন মানুষ শহীদ হয়। আহত হয়ে প্রাণে বেচেঁ যায় আরো ৫ জন। সেদিন সকল শহীদদের একসাথে গণকবর দেওয়া হয়েছিলো। গত ২০১২ সালে শহীদদের জন্য একটি স্মৃতিস্তম্ভ¢ তৈরি করা হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে আজো ৪৪টি শহীদ পরিবার স্বীকৃতি পায়নি।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে পাক হানাদার বাহিনীরা পিছু হটতে শুরু করে। ডিসেম্বর মাসের ১৩ তারিখ সন্ধ্যার পূর্ব মুহুর্তে বিরল উপজেলার ভান্ডারা ও রানীপুকুর ইউপি থেকে পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা পিছু হঁটে দিনাজপুর শহরের দিকে যাওয়ার সময় বিজোড়া ইউপির বহলা গ্রামের লোকজনদের কাছে মুক্তিবাহিনীর খোজ জানতে চায়। খোজ না দেওয়ায় ৪৪জনকে সারিবদ্ধ করে দাড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করে। শহীদ হওয়া ৪৪ জনের মধ্যে দুইজনকে বাদ দিয়ে ৪২ জনকে একসাথে গণ কবর দেওয়া হয়।

তবে শহীদদের সঠিক সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও বিরল উপজেলার বহলা গ্রামের ৪৪জন শহীদ আজও রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন স্বীকৃতি পায়নি। সেদিন যারা শহীদ হয়েছিলেন তাদের অনেকের পরিবার অর্ধহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছে।

দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডর আলহাজ্ব আবুল কাসেম অরু জানান, ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর মাগরিবের নামাজের পর বিরল থেকে পাকবাহিনী দিনাজপুর শহরে ফেরার পথে বিজোড়া গ্রামে প্রবেশ করে। তারা গ্রামবাসিকে বলে মুক্তিযোদ্ধারা এই গ্রামে আছে। এই গ্রামে সার্চ করে প্রায় ৪৪জন পুরুষ মানুষকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। তিনি বলেন, ৪৪জনের মধ্যে ৩৭ জনের নাম জানা গেছে। বাকী ৭ জনের নাম জানা যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে শহীদ ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রেরন করেছি।

বহলা ট্রাজেডীতে শহীদ হওয়া আব্দুল আলিমের ভাই ও বিরলের ৭নং বিজোড়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. আমজাদ হোসেন জানান, ১৩ ডিসেম্বর মাগরিবের নামাজের পর পাকবাহিনী বহলা গ্রামে সার্চ করে প্রায় ৪৪জন পুরুষ মানুষকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। সেই পরিবারগুলোকে আজ পর্যন্ত সরকারীভাবে কোন সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়নি এবং তাদের নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায়ও আসেনি।

আমি চেয়ারম্যান হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু সম্ভব তাদের সহায়তা করেছি। বর্তমান এমপি খালেদ মাহমুদ চৌধুরী শহীদদের জন্য একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছেন। এখানে শহীদ পরিবারের ছেলে-মেয়েদের জন্য একটি মাদরাসা স্থাপন করা হয়েছে। আমি সরকারীভাবে এই ৪৪টি পরিবারকে পুণর্বাসনের অনুরোধ জানাই। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বিজোড়া ইউনিয়নের কমান্ডার সার্জেন্ট (অব.) মো. মজিবুর রহমান এবং এই ইউনিয়নের আরেক মুক্তিযোদ্ধা মো. গোলাম রব্বানী ৪৪টি শহীদ পরিবারের সদস্যদের মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্তসহ তাদের সরকারীভাবে পূণর্বাসনের দাবী জানান।

সেদিনের ঘটনায় ভাগ্যক্রমে বেচেঁ যাওয়া আনিছুর রহমান বলেন, বিরল উপজেলার বহলা গ্রামটি ছিলো মুক্তিবাহিনীর একটি ঘাটি। যেখান থেকে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে অপারেশন চালাতো। পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের স্থানের সন্ধান চাইলে বহলা গ্রামের কেউ দিতে না চাওয়ায় সকলকে এক সাড়িতে দাড় করিয়ে হত্যা করে। সে সময় ভাগ্যক্রমে আমার পায়ে গুলি লাগলে আমি প্রাণে বেচেঁ যাই। পরে নিজ খরচে চিকিৎসা চালিয়ে যাই। এ পর্যন্ত সরকার থেকে কোন ধরনের সহযোগিতা আমি পাইনি।

প্রতি বছর দিনটিকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নানা কর্মসূচী পালন করে। বিরল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে কবর জিয়ারত, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় আলেঅচনা সভা দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহন করেছে। কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে কবর জিয়ারত, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠান।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য