আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট প্রতিনিধি: সাক্ষাৎকার দেওয়া সম্ভব নয়। মুক্তিযোদ্ধা আলতাব হোসেন বেশ অসুস্থ।

চলতি বছরের প্রথম দিকে স্ট্রোক করে ছিলেন। কথা বলতে চাইছেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে বলতে পারছিলেন না। বয়স তাঁর প্রায় ৬৬ বছর। কিন্তু এই বয়সের তুলনায়ও দুর্বল হয়ে পড়েছেন বেশ। আমাদের মনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়।

এদেশে এক একজন মুক্তিযোদ্ধা এক একটি ইতিহাস। স্বাধীন দেশে তাঁরা দীর্ঘায়ু লাভ করুন– এমনটাই কামনা করি মনে মনে। কয়েকটা দিন কেটে যায়। সেলফোনে কথা বলে একদিন অুনমতি মেলে সাক্ষাতের। গর্বিত হই এক বীর মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে। মুক্তিযোদ্ধা আলতাব হোসেন। তাঁর বাবার নাম মৃত আবদার রহমান। বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান ছিলেন তিনি। গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের কাকিনা বাজার সংলগ্ন । মুক্তিযোদ্ধা আলতাব হোসেনের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে গ্রামের বাড়িতেই। অভিযাত পরিবার সন্তান না হলেও ছোটবেলা থেকেই তিনি একজন সাহসী ছেলে ছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল ও হাডু-ডু খেলতেন । এ গ্রাম ও গ্রাম ছুটে বেড়াতেন বন্ধুদের সঙ্গে। দুঃখ জনক মা ছোটবেলায় মারা গিয়েছেন। লেখাপড়া বেশি দূর করতে পারে নি। মায়ের মৃত্যুর পর ব্যস্ত হয়ে পড়েন বাবার সঙ্গে কৃষি কাজে।

রক্ত গরম করা ভাষণ ছিল সেটি
দেশ তখন উত্তাল। নানা বৈষম্য চলছিল। পশ্চিম পাকিস্তানিরা নানাভাবে শোষণ করছিল আমাদের ওপর। এসব খবর পৌঁছে যেত গ্রামে গ্রামে। বড়দের মুখে ও রেডিওর মাধ্যমে নানা খবর জেনে যেত আলতাবরা। সে খবরগুলো উদ্দিপ্ত করতো তাকে। এরমদ্যে ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু। সে ভাষণ শোনেন রেডিওতে। তার ভাষায়, “রক্ত গরম করা ভাষণ ছিল সেটি। বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ ছিল সময়োপযোগী।” দেশ আমাদের, এদেশের জমিজমা আমাদেরই। কিন্তু দেশ যদি পরাধীন থাকে তবে সে জমি বা সম্পদের মূল্য কী থাকে? তাই সবার আগে দেশকে মুক্ত করতে হবে। বাঁচাতে হবে মাতৃভূমিটাকে। এমন চিন্তা থেকে বঙ্গবন্ধুর ডাকেই একরাতে গোপনে বেড়িয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য। তার ভাষায়, “তারিখটা ছিল ১৯৭১ সালের মার্চ মাস। আমি বাড়িতে কাউকে না জানিয়ে গ্রাম থেকে গোপনে চলে যাই যুদ্ধে যোগ দিতে।

শিতাই ক্যাম্পে আমি পৌঁছিলে এবং যুদ্ধে অংশগ্রহন করতে যাইলে মোগলদার নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে শিতাই ক্যাম্পে ভর্তি হই। ভর্তি হলে প্রশিক্ষণের জন্য কোচবিহার ক্যাম্পে আমাদের ৫০ জনকে নিয়ে যায়। প্রশিক্ষণ শেষে আমরা তাবুরহাট ক্যাম্পে যাই। ওখানে গিয়ে আমার এলাকার পরিচিত লোক গুলোর দেখা পেলাম। সেখানে কাকিনারের সন্তান কোম্পানি কমেন্ডার আযহার মাষ্টারের দেখা পেলাম। সেখানে ১২ দিনের স্বল্প মেয়াদী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় আমাদের। শেখানো হয় গেনেড নিক্ষেপ ও হালকা রাইফেল চালানো। অতঃপর শুরু করি অপারেশন।”

ওই ক্যাম্পে আমরা ২শত জন ছিলাম। তার মধ্যে ১শত জনকে চিলাহাটি ক্যাম্পে পাঠানো হলো। আর ১শত জনকে গিজরাট গাও ক্যাম্পে পাঠানো হলো। গিজরাট গাও ক্যাম্পে ১শত জনের মধ্যে আমিও ছিলাম। “আমাদের ক্যাপ্টেন ছিলেন, দেলোয়ার।” ওখান থেকে আমরা মোগলহাটে যুদ্ধ করি। মোগলহাট স্বাধীন হলে। ওখান থেকে আমাদেরকে ক্যাপ্টেন দেলেয়ার বলেন, তোমাদের লালমনিরহাট যেতে হবে। ক্যাপ্টেন দেলোয়ার হোসেনের কথা মতো তারা ৫০ জন লালমনিরহাটের চলে আছেন। এ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেন মুক্তিযোদ্ধা আলতাব হোসেন। এ অঞ্চলটি ছিল ৬ নম্বর সেক্টরের অধীন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, খাবার ও পানি দিয়ে সাহায্য করতো গ্রামের সাধারণ মানুষ। আর এ কারণে উন্নত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওপর কৌশলে গেরিলা আক্রমণ করাটা অপেক্ষাকৃত সহজ হতো মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। এসব অপারেশন গুলোতে সহজেই জয় পেত মুক্তিযোদ্ধারা। এমনিভাবে একের পর এক যুদ্ধ করে যান। তিনি যুদ্ধাকালীন সময় বড় ধরণের ঘটনা ঘটাতে না পারলেও। পাকি সেনাদের বেশ কয় জনকে চরম ভাবে আক্রমণ করে ছিলেন। লালমনিরহাট স্বাধীন হলে।

তারা তিস্তা দিয়ে চলে যান রংপুরে। ওখানে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটলে অস্ত্র জমা দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসেন। মুক্তিযোদ্ধা আলতাব হোসেনের বাবা সন্তানের অপেক্ষায় থাকতেন। কবে তার খোকা বাড়িতে ফিরবে। গ্রামের অনেক ছেলেই ফিরছে। তার ছেলে নেই তার বাবা এদিকে ওদিকে পাগলের মতো খুঁজে বাহির হয়। তিনি ভেবে ছিলেন তার খোকা আর ফিরবে না। অবশেষে মুক্তিরযোদ্ধা আলতাব বাড়িতে ফিরলে বাবা সন্তানকে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরে অজস্র কান্না ভেঙ্গে পরেন। সেই দিনের কথা গুলো বলছেন মুক্তিযোদ্ধা আলতাব হোসেন।

পাঁচ ছেলে নয় মেয়ের জনক এই মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন করে যুদ্ধের মুখোমুখি হন আলতাব হোসেন। তার পরিবার নিয়ে কি ভাবে বাচঁবেন সে চিন্তায় টালমাটাল মুক্তিযোদ্ধা আলতাব হোসেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিজ পিতৃলয় (কাকিনায়) ফিরে আসেন আলতাফ হোসেন । নতুন করে সংসারের হাল ধরেন তিনি। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজ এলাকায় বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করেন। অবশেষে তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ প্রতিষ্ঠাও হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য বসত: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ঠ বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর সবকিছু এ্যালোমেলো হয়ে যায়। আবারও শুরু হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধা আলতাবের পরিবারে স্বাধীনতা বিরোধীদের চক্রাস্ত । ৭৫ এর পর বিএনপি জামায়াত যতবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে ততবারই মুক্তিযোদ্ধা আলতাবের পরিবারে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তারপরেও মুক্তি আলতাব স্বপ্ন দেখতে পিছপা হননি।

আপন গতিতে পরিবার পরিজন নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিনারিপাত করে আসছেন। সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ হোসেন যখন স্বপ্ন পুরণে ব্যস্ত ঠিক তখনি ২০০১ সালে বিএনপি জামায়েত ক্ষমতায় আসার পর পরিবারে নেমে আসে কালো মেঘ। রাতারাতি পরিবারের বৃদ্ধ বাবা সহ দুই সন্তানের নামে মিথ্যা মামলায় প্রায় তিন মাস হাজতবাস করেন। দু- সন্তানকে হাজতবাস বাস থেকে মুক্ত করতে বাবা আলতাব হোসেন শেষ সম্বল হিসাব কৃষি জমিটুকুও বিক্রি করে সন্তানদেরকে কারাগার মুক্ত করেন। শত দু:খ- কষ্ট আর নির্যাতনের পরেও মুক্তি আলতাব একটুও সরে দাড়াননি কাকিনা আওয়ামীলী থেকে। তিনি আওয়ামীলীগকে সুসংগর্ঠিত করেছেন। বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা আলতাব কাকিনা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক, তাঁর বড় ছেলে ফেরাজুল ইসলাম মানিক সাবেক ছাত্র নেতা বর্তমানে ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, ছোট ছেলে ফারুক হোসেন সাবেক ছাত্র নেতা বর্তমান কাকিনা ইউনিয়ন আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক বটে। মুক্তিযোদ্ধা আলতাব হোসেন বিরোধী চক্রের কাছে যতটা নির্যাতন নিপীরণের স্বীকার হয়েছে বা হচ্ছে তার চেয়ে নিজ দলেও কিন্তু কম হয়নি।

মুক্তিযোদ্ধা আলতাব সন্তানদের প্রকৃত মানুষ করতে সব ছেলে মেয়েকে করেছেন শিক্ষিত। তিনি শিক্ষিত ছেলে মেয়েদের মুক্তিযোদ্ধা’র কোটায় সন্তানদের সরকারী চাকুরী করাবেন এটাই ছিলো বড় আশা। সন্তানদের চাকুরীর জন্য স্থানীয় দলীয় নেতাদের পিছনে অনেক সময় ব্যয় করেও সন্তানদের চাকুরী দিতে পারেননি। নেতারা প্রতিবারেই মুক্তিযোদ্ধা আলতাবকে কথা দিয়েছিলেন সন্তানদের চাকুরী দিবেন বলে। মুক্তিযোদ্ধার শেষ জীবনে একটাই চাওয়া পাওয়ার ছিল সন্তানদের সরকারী চাকুরী। ধনীরা নিজেদের ভগবান ভাবছেন কোন সময় খারাপ লাগে? এমন প্রশ্নে তিনি নিশ্চুপ থাকেন। অতঃপর দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে বলেন, “দেশের অধিকাংশ স্থানেই দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। সবাই নিজের উন্নতিতে ব্যস্ত। দেশের উন্নতির চিন্তা কেউ করছে বলে মনে হয় না। স্বাধীন দেশে গরীব আরো গরীব হচ্ছে। ধনীরা নিজেদের ভাবছেন ভগবান। এমন দেশটা তো চাইনি আমরা।” শত হতাশার মধ্যেও পরবর্তী প্রজম্মকে নিয়ে স্বপ্নে বিভোর হন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তার আশা, এদেশ একদিন অনেক এগিয়ে যাবে। তার ভাষায়, “আমরা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছি। আর পরবর্তী প্রজম্ম দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এদেশে থাকবে না কোনো হানাহানি, কাটাকাটি।”

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য