মোঃ লিহাজ উদ্দীন মানিক, বোদা (পঞ্চগড়) থেকেঃ দেশের সর্বউত্তর সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়। হিমালয় কন্যা পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার মহানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত। প্রকৃতির অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর দর্জিপাড়া গ্রামে ছকিনা জন্ম গ্রহণ করে। দরিদ্র্য পিতা পেশায় ছিলেন গরুর গাড়ীয়াল।

ছকিনারা দুই ভাই বোন, ছোট ভাই চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। বাবার ৭ শতক জমির উপর ১টি ছোট জরাজীর্ণ কুঁড়ে ঘর ছাড়া কিছুই ছিল না। জরাজীর্ণ কুঁড়ে ঘরে একটু বৃষ্টি হলে ঘরের চালে ফোটায় ফোটায় বৃষ্টি পড়তো। তারা পাখির নীড়ের মতো জড়ো হয়ে বসে থাকত সমস্ত রাত্রি নিদ্রাহীন অবস্থায়।

ছকিনার ৭ বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ার কারণে, ইচ্ছা থাকা সত্তেও দ্বিতীয় শ্রেণি পার হতে পারেনি। ছকিনার মা’ অন্যের বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করে। তাদের অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে খেয়ে, না খেয়ে কোনো মতে দিন চলে। অবশেষে ১৩ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় ছকিনাকে।

একই গ্রামের জাহের আলীর পুত্র নাসিরউদ্দিন ছকিনাকে বিয়ে করে। এতিম নাসিরউদ্দিনেন কোন জমি-জায়গা, ঘর-বাড়ী, কিছুই ছিল না। সে ছাকিনার বাড়িতে ঘর-জামাই থাকে। স্বামী নাসিরউদ্দীন অন্যের বাড়ীতে কাজ করে যা পায়, তা দিয়ে কোন রকমে তাদের সংসার চলে।

তাই তিন ছেলের ৫ম শ্রেনীর বেশী লেখাপড়া করার সুযোগ পায়নি। অভাবের সংসারে খরচের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায়, ছকিনাও দৈনিক ৩০ টাকা হাজিরা হিসাবে স্কুলে ঝাড়–দারের কাজ নেয়। এমতাবস্থায় দুধের শিশু আর অবুঝ সন্তান ও বুড়ি মা’কে নিয়ে একবেলা খেয়ে না খেয়ে রাত কাটাতে হয়েছে তাদেরকে। ২০০৪ সালে অতিদরিদ্র কর্মসূচি পিআরএ পদ্ধতির মাধ্যমে তেঁতুলিয়া শাখার উদ্দ্যোগে ছকিনা চুড়ান্ত ভাবে নির্বাচিত হয়। ছকিনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে এবং উপযোগিতা যাচাই করে গাভী পালন এন্টার প্রাইজে অন্তর্র্ভূক্ত করা হয়।

কর্মসূচির নিয়মানুযায়ী ছকিনাকে গাভী পালনের উপর তিন দিনের প্রশিক্ষণ শেষে ২জুন ২০০৪ সালে দুইটি গাভী দেওয়া হয়। ছকিনা গাভী দুইটি লালন পালন করতে থাকে। এক পর্যায়ে গাভী দুটি পর্যায়ক্রমে ৬ টি বাছুর হয় এবং ধীরে ধীরে বাছুরগুলো বড় হতে থাকে। ছকিনার গরু বিক্রির টাকা তার স্বামী ব্যবসা শুরু করে। তার স্বামীর ব্যবসার অনেক সফলতা আসে। ছকিনা অতিদ্ররিদ্র্য কর্মসূচির মাধ্যমে দিক নির্দেশনা, সহায়ক ভাতাসহ সামাজিক ও স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ এবং সেবা পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করেন। ছকিনাকে আর পিছনে ফিরে তাকাকে হয়নি। তিন ছেলেদেরকে লেখাপড়া শিখাতে না পারলেও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

স্বামীর ব্যবসার আয়ের ১ লাখ টাকা দিয়ে বসত ভিটা ও আবাদী ৫০ শতাংশ জমি কিনেছেন। ব্র্যাক মাইক্রোফিন্যান্স কর্মসূচি থেকে ঋণের টাকা এবং স্বামীর ব্যবসার আয় দিয়ে গরু খামার দিয়েছেন। সেই খামারে গরু, ছাগল, হাস, মুরগী বিক্রি ও জমির ফসলের বিক্রির আয় এবং স্বামীর ব্যবসার আয় থেকে পর্যায়ক্রমে ৫ লাখ টাকা দিয়ে বিশাল আকারে ৬ রুম বিশিষ্ট পাকা বাড়ী তৈরি করেন। ব্র্যাক থেকে ছকিনা এ পর্যন্ত ১২ বার ঋণ নিয়েছেন এবং পরিশোধ করেন। বর্তমান সাধারণ ঋণ ৩০ হাজার টাকা ও গুড ঋণ ১লাখ ৫০ হাজার টাকা চলমান রয়েছে।

বর্তমানে তার সম্পদ খামারে বিদেশী জাতের গরু ৪টি, ১টি মহিষ, ২টি ছাগল, ২২টি মুরগী ও স্বামীর ব্যবসা এবং নিজস্ব আবাদী জমি ২৫ শতক রয়েছে। যে ছকিনা কুঁড়ে ঘরে বসবাস করত, এখন সে বিশাল আকারে পাকা বাড়ীতে বসবাস করছেন। ছকিনা এখন বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে, গ্রাম্য বিচার-শালিসও করেন। ছকিনার আর্থিক স্বচ্ছলতার কারনে সমাজের মানুষের সেবা করছেন। ছকিনা এখন বাড়ীতে স্বাস্থ্য সম্মত সেনেটারী পায়খানা ব্যবহার ও নিরাপদ পানি পান করে। ছকিনা আরো সামনে এগিয়ে যেতে চায়। তার মতো কোন নারীকে যেন জীবনে কষ্ট পোহাতে না হয়। তার এই অসম্ভব সফলতার জন্য ব্র্যাকের নিকট সে চির কৃতজ্ঞ।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য