নাগেশ্বরীতে ১৮শ টাকায় বাউল কুলের চাষ শুরু করে অর্ধকোটি টাকার মালিক হয়েছে তাইজুল ইসলাম নামের এক যুবক। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী পৌরসভার কুটি পশ্চিম পয়রাডাঙ্গা এলাকার দেলদার হোসেনের ছেলে সে। একজন বেকার যুবক। পারিবারিক অবস্থাও ছিলো না তেমন। বাবার সামান্য স¤পদে টানাপরেনের মধ্যে চলতো সংসার। লেখাপড়ায়ও কাচা। পরিবারের এবং প্রতিবেশীদের অভাব খুব কাছ থেকে অনুভব করেছে সে।

আর এ অভাবই কিছু একটা করার তাড়া করে তাকে। স্বপ্ন দেখে অনেক বড় হওয়ার। তাউজুল জনায়, প্রায় ৫০ জনের সাথে থেকে মাছ চাষ করা থেকে শুরু হয় তার পথ চলা। সেখান থেকে মাত্র ১৮শ টাকা পায়। টাকা হাতে পেয়ে আনন্দের ঝিলিক আসে চোখে মুখে। তার চিন্তা এ টাকা বাজে কোনো কাজে ব্যয় করা যাবে না। কিছু একটা করতেই হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। এই সামান্য টাকায় বাবার এক একর জমির চারপাশে বাঁধ দিয়ে শুরু করে মাছ চাষ।

তখন ২০০৫ সাল। সেই চাষ করা মাছ বাজারে বিক্রি করে ১৩ হাজার টাকা আয় হয় তার। স্বপ্ন আরো প্রসাড়িত হতে থাকে। আয়ের টাকা দিয়ে ২০ শতক জমিতে চাষ শুরু করে বাউকুলের । এতেও বেশ লাভবান হয়। লাভের স্বাধ তার কাজে উৎসাহ জোগায়। পরের বছর আরো ২ একর জমিতে বাউকুল চাষ করে। তাইজুল আরও জানায়, বাউলকুল চাষ করে সেখান থেকে দ্বিগুন লাভ হয় তার ।

লাভের টাকায় শুরু করে আর এক ব্যবসা। বাজার থেকে দুটি গরু কিনে কিছুদিন পর সে গরুও বিক্রি করে দেয়। এতেও লাভ গুনে সে। তখন বিদেশি আরো ৬টা গরু কেনে। সেই গরু থেকে প্রতি বছর বাছুর গরু পায়। সেখান থেকে কিছু গরু বাজারে বিক্রি করে দেয়। এভাবেই টাকার অঙ্কটা ভাড়ি হতে থাকে তাইজুলের। এদিকে বাউকুল চাষেও ব্যাপক সাফল্য অর্জন করতে থাকে।

এরই মধ্যে খবর পেয়ে তাইজুলের বাউলকুলের বাগান পরিদর্শন করেতে যান উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসার মনজুর আলম। এরপর বাউলকুলসহ হাতে নেয়া অন্যান্য প্রজেক্টগুলোও পরিদর্শন করেন তিনি। সেগুলোও পরিদর্শন করেন উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসার, নির্বাহী অফিসার, জেলা প্রশাসকসহ আরও অনেক কর্মকর্তা। এসব প্রকল্প দেখে খুশি হয় পরিদর্শকগণ। পরে সবার পরামর্শ ও সহযোগিতায় ২০১৪ সালে প্রশিকক্ষণ নেয় মাছ চাষের।

প্রশিক্ষণ নিয়েই বড় একটি পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ শুরু করে সে। ক্রমেই লাভের পাল্লা ভাড়ি হতে থাকে এই সফল যুবকের। প্রকল্পটি আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা আগে থেকেই মাথায় ছিল। সব সময়েই শুধু বড় কিছু করার কথা মাথায় কাজ করে তাইজুলের। কিন্তু অনেক অর্থ ইনভেস্ট করতে হবে। কী করবে ভেবে পায় না কিছুই। পরে অবসান হয় সে দুশ্চিন্তারও।

যুব উন্নয়ন অফিসারের সহযোগিতায় কৃষি ব্যাংক থেকে ৫লাখ এবং এবং কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় ১লাখ টাকা। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের শুরুর দিকে প্রকল্প পরিদর্শনে আসেন কর্মসংস্থান ব্যাংকের জেলা কর্মকর্তা। তিনি এ প্রকল্প দেখে একটি বেসরকারী ব্যাংকের মাধ্যমে আরও ১০ লাখ টাকা ঋণ সংগ্রহ করে দিলে ব্যবসায় সবুজ সংকেত পায় সে। ধীরে ধীরে সব লোন পরিশোধ করে।

বাড়তি টাকা দিয়ে আবারও একটি ব্রয়লার সেড তৈরী করে এবং ব্রয়লার মুরগীর ব্যাবসা শুরু করে। লাভবান হয় এতেও। ২০১৬সালে বাউকুল বিক্রির পরে তাইজুলের হাতে যা টাকা আসে তা দিয়ে আরো একটি মুরগী খামার দেয়। যেখানে ৯ হাজার লেয়ার মুরগীর বাচ্চা পালন করে। যেখানে তার সাথে কাজ করতো আরও ১৫-২০জন লোক। শুধু এ দিয়েই শেষ নয়। তবে এবারের চলতি বছরের ভয়াবহ বন্যার শিকার হয় সে।

ব্রয়লারের খামারের প্রায় ৫ হাজার মুরগি মারা গেলে ব্যাপক লোকসান গুনতে হয় তাকে। তবুও থেমে থাকেনি তার পথচলা। ভেঙ্গে না পড়ে আরো ২ বিঘা জমিতে সবজি চাষ করেও লাভবান হয়। চলতে থাকে সব প্রকল্পের কাজ। এভাবেই একটার পর একটা ব্যবসা চালিয়ে যায় বহু কষ্টে। এছাড়াও এরকম করে আবার ১ একর জমিতে কলা বাগান লাগায়।

এখন ছোট প্রতিষ্ঠান থেকে এক ধরনের বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। ধীরে ধীরে উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌছতে থাকে সে। এভাবেই ১৮শ টাকা থেকে এখন অর্ধ কোটি টাকার মালিক হয়েছে তাইজুল। এ বিষয়ে উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসার মনজুর আলম বলেন, আমরা তাইজুলকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করায় সে এগিয়ে যেতে পরেছে। এভাবে আমরা অন্যদেরকেও সহযোগিতা দিচ্ছি। আশা করছি অচিরেই আরো অনেকে তাইজুলের মতো সাফল্য পাবেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য