সাদ আল-হারিরিকে আটকে রেখে এবং তাকে জোর করে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করিয়ে সৌদি আরবই লেবানন ও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে বলে অভিযোগ করেছেন হিজবুল্লাহ প্রধান সাইয়েদ হাসান নাসরুল্লাহ।

লেবাননকে অস্থিতিশীল করতে সৌদি আরব এসব করছে বলে শুক্রবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে দাবি করেন তিনি, খবর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের।

ভাষণে নাসরুল্লাহ বলেন, “বিষয়টা হলো, তাকে (সাদ) আটকে রাখা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত লেবাননে ফিরে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। এর মাধ্যমে সৌদি আরব ও এর কর্মকর্তারা লেবানন এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।”

গত সপ্তাহে সৌদি আরবের এক মন্ত্রী ‘লেবানন সৌদি আরবের দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে’ বলে অভিযোগ করেছিলেন। নাসরুল্লাহ বক্তব্যকে তার পাল্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সাদকে ‘আটকে রেখে’ সৌদি আরব লেবাননের সব নাগরিককে অপমান করেছে বলেও মন্তব্য করেন এই হিজবুল্লাহ নেতা। সৌদি আরব ইসরায়েলকে লেবাননে হামলায় উৎসাহিত করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ইসরায়েলের হামলার আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে না দিয়ে তিনি বলেন, তেমনটা হলে ইসরায়েলকেও জন্য এর জন্য চরম মূল্য দিতে হবে।

“যে কোনো ধরনের ভুল পদক্ষেপ কিংবা পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টার ব্যাপারে আমি তাদের সতর্ক করছি,” ইসরায়েলের উদ্দেশ্যে বলেন নাসরুল্লাহ।

অন্যান্য ফ্রন্টের মতো লেবাননেও সৌদি আরব পরাজিত হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এর আগে বৃহস্পতিবার লেবাননের দুই শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা, সাদ ঘনিষ্ঠ এক রাজনীতিক ও অপর একটি সূত্রও সাদকে রিয়াদে আটকে রাখার অভিযোগ করেছিলেন।

শুক্রবার লেবাননের প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন সৌদি আরবের একদল প্রতিনিধিকে বলেছেন, “সাদকে অবশ্যই লেবাননে ফিরে আসতে হবে।”

সৌদি আরবে থাকা অবস্থায় সাদের পদত্যাগের ঘোষণা ও তার পরবর্তী পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেছেন আউন।

শুক্রবার ফরাসী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতেও সাদকে আটকে রাখার ইঙ্গিত দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, সাদ তার ইচ্ছানুযায়ী চলাফেরা করতে এবং লেবাননে তার ওপর অর্পিত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন বলে ফ্রান্সের আশা।

আগের দিন এক আকস্মিক সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সৌদি আরবে গিয়ে দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।

তাদের বৈঠকেও সাদ এবং ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে ধারণা করছে রয়টার্স। এরপরই ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাদকে নিয়ে বিবৃতিটি দেয়।

সৌদি আরব অবশ্য শুরু থেকেই এই অভিযেোগ অস্বীকার করে বলছে, সাদকে আটকে রাখা হয়নি। ‘হিজবুল্লাহ বৈরুতের রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামো দখলে নেওয়ার’ কারণেই লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ বলেও দাবি তাদের। হিজবুল্লাহর প্রভাব কমাতে না পারায় সাদ নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনাও করেছে রিয়াদ।

গত সপ্তাহের শুরুতে ‘প্রাণনাশের আশঙ্কার’ কথা জানিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ। এজন্য ইরান ও হিজবুল্লাহকে দায়ী করেন তিনি।

সাদের অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা অভিযোগে তেহরান বলেছে, সাদ ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সঙ্গে সামিল হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ানোর ষড়যন্ত্রেই পদ ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

২০০৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত আরো এক দফা লেবাননের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপালনকারী সাদ আগে থেকেই সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি ফের লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলন।

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েক দফা সৌদি আরব সফর করা সাদের পদত্যাগের ঘোষণাটিও রিয়াদে রেকর্ড করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দুই বছরের রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর গত বছর ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে সুন্নি ও শিয়া সমর্থিত প্রধান দলগুলোর সমঝোতায় লেবাননের প্রধানমন্ত্রী হন সাদ হারিরি। সমঝোতায় অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে হিজবুল্লাহও ছিল।

২০০৫ সালে গাড়ি বোমা হামলায় সাদের বাবা রফিক আল-হারিরির মৃত্যুর পেছনে শিয়া এই গোষ্ঠীটির হাত আছে বলে কারো কারো সন্দেহ।

সাদ প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেওয়ায় লেবানন নতুন করে রাজনৈতিক সঙ্কটে পড়তে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। তার পদত্যাগ লেবাননের ইরান সমর্থিত শিয়া ও সৌদি আরব সমর্থিত সুন্নি গোষ্ঠীগুলোকে মুখোমুখি অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে বলেও ধারণা তাদের।

আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানকে প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করে সৌদি আরব। সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়া ও ইয়েমেনসহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলা নানা সংঘাতেও একে অপরের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে তারা। লেবাননের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশদুটির দ্বন্দ্ব আরও তীব্রতর হবে বলেও অনেকের আশঙ্কা।

সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে তাদের নাগরিকদের লেবাননে যাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছে, যারা সেখানে আছে তাদেরও দ্রুত দেশটি ছেড়ে যেতে অনুরোধ করেছে।

পশ্চিমা দেশগুলো এই বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন অন্য দেশ ও গোষ্ঠীগুলোকে লেবাননকে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ‘ছায়া যুদ্ধ’ উসকে দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।

তিনি বলেন, ওয়াশিংটন লেবাননের স্বাধীনতাকে জোর সমর্থন দিচ্ছে এবং সাদ আল-হারিরিকে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অংশীদার হিসেবেই বিবেচনা করছে।

টিলারসনের বিবৃতিতে সাদকে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে।

শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, সাদকে রিয়াদে আটকে রাখা হয়েছে এমন কোনো ইঙ্গিত তারা পাননি। যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিতে নজর রাখছে বলেও জানান তিনি।

রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ বেশ কয়েকটি দেশ লেবাননকে ‘আঞ্চলিক উত্তেজনা থেকে দূরে রাখতে’সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য