আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট প্রতিনিধি : লালমনিরহাটে তিস্তার চরের ও নদী ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর দুঃখ-দুর্দশার শেষ নেই। জেলায় প্রতি বছর নদী ভাঙনের কবলে পড়ে বসতভিটা হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে হাজারো পরিবার। মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় ওইসব পরিবার রাস্তা বা অন্যের জমিতে ঝুপড়ি ঘর তুলে কোনো রকম আশ্রয় নেয়। ভাঙনের শিকার হওয়া মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে নদী থেকে পাথর ও বালু তোলা এবং পাথর ভাঙা, রিকশা চালানো, মাছ ধরাসহ দিনমজুরের কাজ করে আসছিলেন। তবে ঈদ ও পূজার পর এসব দিনমজুর অনেকেই এখন কাজের অভাবে বসে আছে। ফলে অর্ধাহারে-অনাহারে তাদের দিন কাটছে।

সরেজমিন দেখা যায়, লালমনিরহাট জেলায় অবস্থিত দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ। তিস্তার বাম তীরে নদী ভাঙনকবলিত হাজার হাজার পরিবার রাস্তা-ঘাট, স্কুল মাঠ ও রেললাইনের পাশে বসবাস করছে। এ দৃশ্য চোখে পড়ে ব্যারাজ থেকে তিস্তা রেল সেতু পর্যন্ত এলাকাজুড়ে। অথচ এক সময় এ পরিবারগুলোর গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে রাক্ষসী তিস্তার হিংস থাবায় সহায়সম্পদ হারিয়ে এখন তারা নিঃস্ব। যে যেখানে পেয়েছে সেখানে আশ্রয় নিয়ে কোনো রকম বেঁচে আছে। অনেকেই ভিক্ষার ঝুলি কাঁধে নিয়ে ঘুরছে গ্রামে গ্রামে। কেউবা পূর্বের পেশা ছেড়ে জীবিকার তাগিদে কুলি-মজুরের কাজ করছে।

জেলায় নদী ভাঙনের কারণে শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও নতুন কোনো কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে না। বর্তমানে মাটি কাটা, ধান কাটা, নদী থেকে বালু ও পাথর তোলা কাজ বন্ধ। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। এসব শ্রমিক এখন তাদের সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। তিস্তা ব্যারাজের বাম তীরে গাইন বাঁধে ছাপড়া তুলে ৪ ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কোনো রকম দিন কাটাচ্ছেন শমসের আলী। দুই মাস আগে তিস্তায় তার শেষ ভিটামাটি চলে গেছে। এখন দোয়ানী বাজারে তিনি কুলির কাজ করেন। শমসের আলীর স্ত্রী আলেয়া বেগম জানান, আজ থেকে ৩৭ বছর আগে যখন তার বিয়ে হয়, তখন তার স্বামী ৩ থেকে সাড়ে ৩শ’ মণ ধান পেত।

সারা বছর খেয়ে ২শ’ মণ ধান বিক্রি করত। এখন তাদের বাড়ি করার জমি নেই। এক দিন স্বামী কুলির কাজ না করলে হাঁড়িতে চাল উঠে না। সব কিছু ভাগ্যের পরিহাস। একই এলাকার বৃদ্ধ জসিম মোল্লা ১৯৭০ সালে এসএসসি পাস করেছেন। বাবার একমাত্র ছেলে হওয়ায় চাকরি করেননি। এখন ৬৩ বছর বয়সে তিনি ঝাল মুড়ি বিক্রি করছেন। জসিম মোল্লা বলেন, আমাকে এ বয়সে ঝাল মুড়ি বিক্রি করতে হবে এ কথা কখনো ভাবিনি। সব কিছুই যেন আজ স্বপ্নের মতো মনে হয়। বৃদ্ধ করিম বকস, জেদা বিবি, ছলিম ভাটিয়াসহ অনেকেই জানান, তিস্তা নদী গোটা লালমনিরহাট জেলাবাসীকে শুধু কষ্ট দিয়ে আসছে।

দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ এ জেলায় অবস্থিত হলেও তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত গোটা জেলাবাসী। সেচ প্রকল্পের কারণে জেলার অনেক স্থান আজ নদী ভাঙনের শিকার হচ্ছে। যে কারণে ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। হাতীবান্ধা উপজেলা চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন বাচ্চু বলেন, তিস্তা নদী ভাঙনের কারণে প্রতি বছর হাজারো পরিবার বসতবাড়ি হারিয়ে গৃহহীন হয়ে পড়ে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। তারপরও অনেকেই জীবন-জীবিকার সন্ধানে পরিবার-পরিজনদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছেন। এছাড়া এ অঞ্চলের একটি বিশাল অংশ দিনমজুর শ্রেণী। বর্তমান এলাকায় তেমন কোনো কাজ না থাকায় তারা কিছু অতিরিক্ত অর্থের আশায় বাইরে যাচ্ছে। এলাকায় কাজ শুরু হলে তারা আবার ফিরে আসে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য