কুড়িগ্রাম জেলার শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নাগেশ্বরী কলেজ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে ১৯৬৭সালে যাত্রা শুরু হয় এ কলেজের। এমন দুর্গম এলাকার সন্তানদের উচ্চ শিক্ষা প্রদানের জন্য প্রয়োজন একটি কলেজের। সেই স্বপ্নে বিভোর অত্র এলাকার তৎকালীন সময়ের সম্মানিত ব্যক্তি মরহুম আলহাজ্ব সাইফুর রহমান, মরহুম ডাক্তার ওমর আলী, মরহুম আব্দুল মালেক মুন্সী, মরহুম মহসিন আলী মিয়া, মরহুম মোজাহার হোসেন ব্যাপারী, মরহুম আব্দুল ওয়াদুদ খাঁন, নেওয়াশী ইউপির প্রাক্তন চেয়ারম্যন খন্দকার গোলাম মোস্তফাসহ আরো অনেকে। কলেজটি প্রতিষ্ঠার জন্য দিন রাত পরিশ্রম করেছিলেন শিক্ষানুরাগী এই মহান ব্যক্তিগণ। সে সময় তরুণ-যুবকরা দিন-রাত গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে ধান, চাল, গম, ভুট্টা, পাট, সরিষা, ডাল ইত্যাদি কালেকশন করে প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নে অংশ নেয়। প্রথম ভারপ্রাপ্ত হিসেবে অধ্যক্ষের দাযিত্ব পান ডিএম একাডেমির প্রধান শিক্ষক শাহ্ হাবিবুর রহমান।

বর্তমান নাগেশ্বরী উপজেলার চারচালা ঘরটি এর পাঠদান হিসেবে ব্যাবহার করা হয়। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ কলেজটির জায়গা বাছাইয়ে মনোযোগ দিলে বর্তমান অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও গোলাপ খাঁ শিশু সদনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রবিউল ইসলাম খাঁনের মা রেজিয়া খানমকে অনুরোধ করলে ঠাঁই মেলে এ প্রতিষ্ঠিানটির। পরে লজিং মাস্টার মরহুম গোলাপ উদ্দিন সার্ভেয়ারসহ পরিশ্রমী মানুষগুলো জমি মেপে ডিএম একাডেমির তৎকালীন ছাত্রাবাস এবং কামিল মাদরাসার একটি ঘর কাঁধে করে এনে দাঁড় করায়। এক হাঁটু কাদা, তার মধ্যে ধারার বেড়া আর বাঁশের খুঁটি দিয়ে শুরু হয় এর পথচলা। সেসময় বড় অভাব ছিলো যোগ্যতা স¤পন্ন শিক্ষকের।

দুঃসহ ধরলা নদীর কারণে অনেকে শিক্ষকতা করতেও আগ্রহী ছিলো না দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষক খুঁজে আনলেও সরকারিভাবে তেমন সুযোগ-সুবিধা পাননি শিক্ষকগণ। এলাকাবাসীর আদায়কৃত ধান, চাল, পাট, গম ইত্যাদি বিক্রির অর্থ থেকে বেতন দেয়া হতো শিক্ষকদের। পরে নাগেশ্বরী হাট কলেজের উন্নয়নের জন্য ইজারা নিলে আসতে থাকে এর স্বচ্ছলতা। সে সময় শিক্ষকের সংখ্যা ছিলো মাত্র ৬ জন এবং কর্মচারী ছিলো ৩ জন। ছাত্রছাত্রিও ছিলো স্বল্প সংখ্যক। পরে ধীরে ধীরে আসতে থাকে শিক্ষার্থী।

বর্তমান অবস্থা:
বর্তমানে এ কলেজের যেমনই শ্রী বৃদ্ধি হয়েছে তেমনই এর উন্নয়নও হয়েছে বিভিন্ন দিক থেকে। এখন এখানে ডিগ্রি লেভেল ছাড়াও খোলা হয়েছে অনার্স লেভেলও। শিক্ষকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৯ জন। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজারেরও অধিক। প্রতি বছর এইচএসসি এবং ডিগ্রি পর্যায়ের ফলাফলও বেশ চমক সৃষ্টি করার মতো। জেলার শ্রেষ্ঠ কলেজ হিসেবে এখন এ প্রতিষ্ঠান সারাদেশে পরিচিতি লাভ করেছে। ১৯৯৭ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজশাহী বিভাগে বাণিজ্য বিভাগ থেকে মেধা তালিকায় ১৮তম স্থান অধিকার করে আশরাফুল আলম। ২০০৯সালে ¯œাতক পাস বিএসসি পরীক্ষায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধা তালিকায় ১৭তম এবং ২০০৭সালের ¯œাতক পাস পরীক্ষায় বিএসসি তে অনেক নামী-দামী কলেজকে পিছেনে ফেলে মেধা তালিকায সারাদেশে প্রথম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করেন আলতাফ হোসেন এবং ১৭তম স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করেন আতাউর রহমান।

এছাড়াও ২০০৮সালের বিএসসিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনে মেধা তালিকায় ১৭তম এবং ২০১১সালে ৯ম স্থান করেন আরো ২ জন মেধাবী ছাত্র। এখানকার অনেক প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী এখন বিভিন্ন দপ্তরের উঁচু সিঁড়িতে অধিষ্ঠত আছেন। এখন এ কলেজটি ক্রিড়া, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক চর্চায় এগিয়ে রয়েছে অনেকাংশে। এখানে বাংলাদেশ উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে উচ্চ মাধ্যমিক, বিএ, বিএসএস প্রোগ্রাম চালু রয়েছে প্রায় ১৩বছর যাবৎ। কলেজটি দেশের শীর্ষ তালিকায় থাকলেও শিক্ষার্থীদের মাঝে লক্ষ্য করা গেছে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা। কারণ কলেজে রয়েছে, কলেজ হোস্টেলের সিট সঙ্কট, শিক্ষার্থীদের পৃথক কমন রুম, কলেজ ক্যান্টিন, অডিটরিয়াম, মুক্তমঞ্চ, প্রশস্ত খেলার মাঠ।

আর মাঠে থাকলেও সামান্য বৃষ্টিতে পানি জমে যায় বলে কোনো খেলাধুলা করতে পারে না শিক্ষার্থীরা। তাই মাঠে মাটি ভরাটকরণ অতীব জরুরি বলে জানিয়েছে তারা। এমনকি অভাব রয়েছে কলেজ পাঠাগারের পর্যাপ্ত বই এবং বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতি। এ সবই তাদের প্রাণের দাবি। তবে বর্তমান এ কলেজটিতে উন্নয়নের ছোঁয়াও কম নয়। অত্যন্ত মেধা ও মনশীলতার পরিচয দিয়ে কলেজটির সুনাম অক্ষুন্ন রাখছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রুহুল আমিন মন্ডল রেজা। কলেজটির সার্বিক উন্নয়নে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন দিন-রাত। কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রুহুল আমিন মন্ডল রেজা বলেন, বর্তমানে কলেজে অত্যন্ত মনোরম পরিবেশে পাঠদান হচ্ছে। সকল শিক্ষক তাদের মেধা ও শ্রম দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে আসছেন নিয়মিত। তবে কলেজ বাউন্ডারি, কলেজের রাস্তা সংস্কারসহ অন্যান্য সমস্যাগুলো সমাধান হলে শিক্ষার্থীদের জন্য আরো সুবিধা হতো। এজন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য