পার্বতীপুর (দিনাজপুর) সংবাদদাতাঃ জন্ম থেকেই বাক প্রতিবন্ধী নাসরিন (১২)। বাবা নুরুল ইসলাম একজন হোটেল শ্রমিক। অগ্নি বণিক (৬) এক পা নেই তার। ক্রেসে ভর দিয়ে স্কুলে আসে। বাবা সুব্রত বণিক হোটেল শ্রমিক। টিয়া (১৩) বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। বাবা অখিল আহম্মেদ একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। শুধু নাজনীন, অগ্নি আর টিয়া নয় পার্বতীপুরের ১৬৫ জন প্রতিবন্ধি শিশুদের নিয়ে আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছে পার্বতীপুরের আলোর পথে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়। প্রতিবন্ধী শিশুরা যাতে সমাজের বোঝা বা ধিকৃত না হয় সে জন্য তাদের শিক্ষার পাশাপাশি শেখানো হচ্ছে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে এমন কিছু কর্মমূখী শিক্ষা।

পার্বতীপুর শহরের রেলওয়ে লেভেল ক্রোসিং সংলগ্ন স্থানে ২০১১ সালে যাত্রা শুরু করে আলোর পথে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়টি। বিদ্যালয়ের ১৯ জন শিক্ষকের অধিকাংশই প্রতিবন্ধী। বিদ্যালয়টিতে গেলে চোখে পড়ে ৫থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের পাঠদান কাজ চলছে। কোন কোন ক্লাসে শিশুরা বিভিন্ন ধরনের খেলনা নিয়ে মনের আনন্দে খেলাধুলা করছে। নাচের ক্লাসে নিত্য প্রদর্শন করছে কেউকেউ। গান শিখছে গানে আগ্রহী শিশুরা। মনের মাধুরী মিশিয়ে ছবি আঁকার কাজে ব্যস্ত দেখা গেল কোন কোন শিশুদের।

আর সবকিছুই তদারকী করছেন ওই বিদ্যালয়ের প্রতিভাবান দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সিনিয়র সহকারী শিক্ষক মঞ্জুরুল ইসলাম। যে কিনা ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে অনার্স মাষ্টার্স করে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে যোগদান করেছেন। অন্ধ হলেও প্রতিভাবান মনজুরুল বিদ্যালয়ের লেখালেখির সব কাজ নিজ হাতে কম্পিউটারে কম্পোজ করে থাকেন। মঞ্জুরুলের বাড়ী পার্বতীপুর শহরের পুরাতন বাজার এলাকায়।

প্রতিবন্ধি অগ্নি’র বাবা সুব্রত বণিক বলেন, তার ছেলে হাটতে পারতো না । এ কারনে তাকে এতোদিন কোন স্কুলে ভর্তি করা হয়নি। আলোর পথে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্টাতা তাকে ক্রেস সরবরাহ করায় সে ক্রেসে ভর দিয়ে নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মোঃ মোস্তাকিম সরকার বলেন, নানা সংকট মোকাবেলা করেই তিনি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়টি গড়ে তুলেছেন। এলাকার ১৬৫ জন প্রতিবন্ধী শিশুকে খুজে বের করে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বই,খাতা, কলম, যাতায়াত সবকিছুই বিনামূল্যে বিদ্যালয় থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, পাঁচ শ্রেনীর প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী তার প্রতিষ্ঠানে আছে।

এদের মধ্যে রয়েছে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, বাক ও শ্রবন প্রতিবন্ধী, পালসি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। বিদ্যালয়টি পরিচালিত হচ্ছে নানা জনের সহায়তায়। সম্প্রতি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তির সহায়তায় নাজনীন নামের বাক প্রতিবন্ধী শিশুর কানে শ্রবন মেশিন লাগানো হয়েছে। সবে মাত্র তার কানে পৌছেছে পৃথিবীর শব্দ । শব্দ শুনে ছোট শিশুর মত আচরন করে কথা বলার চেষ্টা করছে শিশুটি। শিক্ষকদের বেতনসহ বিদ্যালয়টি পরিচালনা করতে যথেষ্ট খরচ হচ্ছে তার। খরচ চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের পরিবহন গাড়ী ও বেঞ্চ সংকোট দেখা দিয়েছে। সরকারী সহায়তা পেলে এবং শিক্ষকরা এমপিও ভূক্ত হলে সংকোট কেটে যাবে। এখানে শিশুরা প্রাক প্রাথমিক থেকে ৫ম শ্রেনী পর্যন্ত লেখা পড়া করতে পারবে। সেই সাথে কর্মমূখী শিক্ষায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, তিনি ব্রেইলি পদ্ধতিতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স মাষ্টার্স পাশ করেছেন। তিনি স্কিন রিডিং পদ্ধতিতে কম্পিউটারের বাংলা ও ইংরেজী কম্পোজ করতে পারেন। একই সাথে ইন্টারনেট ব্রাউজিং করতে পারেন। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র তাকে মাথায় হেডফোন ব্যবহার করতে হয়। তিনি বলেন, পার্বতীপুরের সব ধরনের প্রতিবন্ধীদের নিয়ে একটি মডেল স্কুল গড়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। যে স্কুলকে দেখে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করতে অনেকেই এগিয়ে আসবে।

বিদ্যালয়ের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার তরফদার মাহমুদুর রহমান বলেন, পার্বতীপুর উপজেলায় বিভিন্ন বয়সী ৩হাজার ৮শ জনের মতো প্রতিবন্ধী রয়েছে। বিভিন্ন এনজিও প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। তবে আলোর পথে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়টি স্বতন্ত্র ভাবে ১৬৫ জন শিশুকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। সেখানকার শিশুদের সরকারী সব ধরনের সহায়তা ছাড়াও স্কুল ফিডিং এর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানটি ইতি মধ্যে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রনালয় থেকে স্বীকৃতি প্রাপ্ত।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য