আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট থেকে: উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাট এর মধ্যবর্তী কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-২ সংসদীয় আসন। দুটি উপজেলাতেই আটটি করে মোট ১৬টি ইউনিয়ন। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টির জোট হলে এ আসনে জোট প্রার্থীর বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত। আর আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপির মধ্যে ত্রিমুখী নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে জাতীয় পার্টি প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

দলীয় কোন্দল না থাকায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাদে ১৯৯১ থেকে গত পাঁচ সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে নির্বাচিত হন সরাসরি জাপার ও মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির (জাপা-এরশাদ) প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রয়াত মজিবর রহমান। তবে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র কিনলেও শেষ পর্যন্ত জমা দেননি তিনি। ফলে এ আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নুরুজ্জামান আহমেদ,যিনি বর্তমানে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী। আসনটি একসময় জাপার দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল।

বর্তমানে জাপা ও দলীয়প্রধানের জনপ্রিয়তা আগের মতো নেই। এ আসনে বর্তমানে আওয়ামী লীগের একক সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ। কালীগঞ্জ উপজেলায় তার বাড়ি। তার বাবা প্রয়াত করিম উদ্দিন আহমেদ ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। মূলত বাবার হাত ধরেই তার রাজনীতিতে হাতেখড়ি। প্রথমে ইউপি চেয়ারম্যান, পরবর্তী সময়ে কালীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। প্রথমবারের মতো বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে প্রথমে খাদ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। বর্তমানে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন নুরুজ্জামান আহমেদ। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ভালোভাবেই নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন এই নেতা। আর মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে জনগণের আরও কাছাকাছি যাওয়াটাও তার জন্য সহজ হয়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অনেকটাই উন্নয়নবঞ্চিত কালীগঞ্জ-আদিতমারী উপজেলায় তিনি নানামুখী উন্নয়নকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা মনে করেন, এ আসনে নুরুজ্জামান আহমেদের বিকল্প প্রার্থী নেই আওয়ামী লীগে। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-জাপার জোট হলেও তিনিই হবেন জোট প্রার্থী।

নুরুজ্জামান আহমেদ বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এখনো নিজকে একজন সক্রিয় কর্মী মনে করি। আমি দীর্ঘদিন তৃণমূলে রাজনীতি করেছি। সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও জননেত্রী শেখ হাসিনার দয়ায় আজ আমি প্রতিমন্ত্রী। আবারও দলীয় মনোনয়ন পাব বলেই মনে করি। সাম্প্রতিক সময়ে লালমনিরহাট-২ আসনে মূলত জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু এবং জেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ও সাবেক এমপি সালেহ উদ্দিন আহমেদ হেলালের মধ্যে দীর্ঘদিন থেকে মতবিরোধ চলছে। দলটির কালীগঞ্জ উপজেলা কমিটি গঠন নিয়ে এখনো চলছে টানাপড়েন। আদিতমারী উপজেলা বিএনপি সভাপতিসহ প্রভাবশালী কয়েক নেতা আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার ফলে আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে দৃশ্যমান কর্মকা- দেখা যাচ্ছে না দলটির মাঝে। এর পরও স্থানীয়ভাবে তারেক রহমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত সালেহ উদ্দিন আহমেদ হেলাল অন্য বারের মতো এবারও এ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে। এলাকায় সৎ ও ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত সালেহ উদ্দিন আহমেদ হেলাল মনোনয়ন পাবেন বলে তার সমর্থক নেতাকর্মীদের ধারণা। এ লক্ষ্যে যতটা সম্ভব তিনি কাজও করে যাচ্ছেন, সীমিত আকারে হলেও নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় কিংবা গণসংযোগ চালাচ্ছেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকেরও দায়িত্ব পালন করেন।

সালেহ উদ্দিন আহমেদ হেলাল বলেন, আমি এর আগেও সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। নিয়মিত দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগসহ দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। তাই এবারও আমি দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী। নানা হিসাব-নিকাশে দলীয় কোন্দল থাকায় এ আসন থেকে সদর আসনের পাশাপাশি জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুও মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে। ১৯৯০ সালে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর সারা দেশে কার্যত জাতীয় পার্টি ও এরশাদের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে থাকলেও লালমনিরহাট-২ আসনটি ২০০৮ সাল পর্যন্ত দখলে রেখেছিলেন জাপার প্রার্থী প্রয়াত মজিবর রহমান। মূলত আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলের কারণে তিনি বারবার বিজয়ী হয়েছিলেন বলে মনে করেন অনেকে। যদিও জাপার দলীয় কর্মকা- সে সময় একেবারেই ছিল না বললেই চলে। বিএনপি থেকে জাপাতে আসা একক সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রোকন উদ্দিন বাবুল চেষ্টা চালাচ্ছেন এ আসনে জাতীয় পার্টি টিকিয়ে রাখতে।

তিনি দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সমাজকল্যাণ সম্পাদক। এ আসনে দলের কা-ন্ডারি হিসেবে একাদশ সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করে দল গোছানোর কাজে নেমেছেন। নিয়মিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় ও সভা-সমাবেশ চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০১৪ সালের ১১ জুন কালীগঞ্জের চাপারহাটে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে জাপার চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ লালমনিরহাট-২ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে রোকন উদ্দিন বাবুলকে পরিচয় করিয়ে দেন। দলের প্রাথমিক তালিকাতেও তিনি জাপার একক প্রার্থী হিসেবেই আছেন। এদিকে আওয়ামী লীগ-জাপা নির্বাচনী জোট হলে রংপুর অঞ্চলের আসন হিসেবে লালমনিরহাট-২ জাপার প্রার্থীই পাবেন বলে মনে করেন বাবুলসহ তার অনুসারীরা। রোকন উদ্দিন বাবুল বলেন, এই আসনে বারবার জাতীয় পার্টির প্রার্থীই জিতে এসেছেন। আর মজিবর রহমান মারা যাওয়ার পর দুই উপজেলার ওয়ার্ড-ইউনিয়ন কমিটিগুলো নতুন করে গঠিত হওয়ায় চাঙ্গা হয়েছে দল। আগামীতেও এ আসনে লাঙ্গল বিজয়ী হবে বলে আশা করি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য