বাগদাদের সামরিক হামলার ‘হুমকি’ ঠেকাতে উত্তর ইরাকের তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল কিরকুকে আরও কয়েক হাজার সেনা পাঠানোর কথা জানিয়েছে কুর্দি কর্তৃপক্ষ।

মুখোমুখি লড়াই ঠেকাতে ডিফেন্স লাইন খানিকটা পিছিয়ে আনারও ঘোষণা দিয়েছে তারা।

শুক্রবার কুর্দিস্তানের আঞ্চলিক সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট কোসরাত রাসুল কিরকুকে নতুন করে আরও ছয় হাজার সৈন্য পাঠানোর কথা জানান বলে খবর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের।

আগে থেকেই ওই এলাকায় হাজার হাজার পেশমেরগা যোদ্ধা অবস্থান করছে; বেশ কয়েকটি তেলখনি সমৃদ্ধ এলাকাটিতে নতুন করে আরও সেনা পাঠানোর মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান কয়েকগুণ শক্তিশালী করে নিলো কুর্দিরা।

গত মাসে স্বাধীনতার প্রশ্নে অনুষ্ঠিত এক গণভোটের সূত্র ধরে কুর্দিস্তানের আঞ্চলিক সরকার (কেআরজি) ও বাগদাদের কেন্দ্রীয় সরকার মুখোমুখি অবস্থান নেয়। ভোটে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় এলেও তা প্রত্যাখান করে কুর্দিদের একঘরে করতে বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞাসহ নানান ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নেয় বাগদাদ।

ইরাকের কঠোর অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানায় ইরান ও তুরস্ক। দুটি দেশেই বিপুল সংখ্যক কুর্দির বাস। উত্তর ইরাকে কুর্দিস্তানের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হলে তা ইরান ও দীর্ঘদিন ধরে কুর্দি বিদ্রোহীদের মোকাবেলায় ব্যস্ত তুরস্কের জন্যও চাপ হয়ে দাঁড়াবে।

বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে কেআরজির নিরাপত্তা কাউন্সিল কিরকুকের দক্ষিণে ‘ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি, হাম্বি সামরিক যান ও মর্টার’ সজ্জিত ইরাকি বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধিতে উদ্বেগ জানায়।

“তারা পেশমেরগা যোদ্ধাদের থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থান নেয়। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, কাছাকাছি তেলখনি, বিমানবন্দর ও সামরিক ঘাঁটিগুলো দখলে নেয়াই তাদের উদ্দেশ্য।”

পরে কুর্দি নিরাপত্তা বাহিনীসংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানায়, ইরাকি বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়াতে তারা দক্ষিণ কিরকুকের আগের অবস্থান থেকে আরও ৭ কিলোমিটার পিছিয়ে এসে অবস্থান নিয়েছে।

রয়টার্স বলছে, কিরকুকের যে অংশ থেকে কুর্দিরা সরে গেছে সেখানে শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ; এদের বেশিরভাগই বাগদাদ সরকারের সমর্থক এবং তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও আধাসামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত।

তবে ইরাকি বাহিনীর দাবি, কুর্দিদের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, কয়েক সপ্তাহ আগে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের কাছ থেকে হাওয়াইজা পুনরুদ্ধারের পর সে অঞ্চলে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা ও পরিদর্শনের উদ্দেশ্যেই দক্ষিণ কিরকুকে সেনা অবস্থান।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদিও বারবার বলছেন, কুর্দিদের ওপর আক্রমণ করার পরিকল্পনা তাদের নেই।

কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের সীমানার বাইরে অবস্থিত কিরকুকের বাসিন্দা ১০ লাখের বেশি। বিভিন্ন এলাকায় আইএসের কাছে ইরাকি বাহিনী পরাজিত হওয়ার পর কিরকুকের তেলখনিগুলো জিহাদিদের কাছ থেকে রক্ষায় সেখানে পেশমেরগা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। তারপর থেকেই এলাকাটি কুর্দিদের নিয়ন্ত্রণে।

কেআরজি বলছে, স্বাধীন কুর্দিস্তান প্রতিষ্ঠায় ২৫ সেপ্টেম্বরের গণভোটে রায় এলেও ইরাকি বাহিনী তা প্রত্যাখ্যান করে নতুন যুদ্ধ শুরুর পাঁয়তারা করছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতি এড়াতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছেন কেআরজির প্রধানমন্ত্রী নেচিরভান বারজানিও।

শুক্রবার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জেমস ম্যাটিস বলেছেন, তারা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন; এটি যেন সংঘাতের আকার ধারণ না করে তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

“আমরা দুই পক্ষকে মুখোমুখি হতে দিতে পারি না। আমরা চাই না পরিস্থিতি একটি যুদ্ধ দিকে যাক। শক্তি বৃদ্ধির অবস্থান থেকে সরে এসে সমস্যাটির রাজনৈতিক সমাধানে আগ্রহী করে আমরা এর মিটমাট করতে চাই,”বলেন ম্যাটিস।

কেআরজি ও বাগদাদ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জার্মানিও উত্তেজনা কমাতে দুই পক্ষকেই এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে।

“আমরা দুই পক্ষকেই দায়িত্বের প্রতি সচেতন এবং সংঘাত পরিহারের আহ্বান জানাচ্ছি,” বার্লিনে জার্মান সরকারের মুখপাত্র স্টিভেন সিবার্ত এমনটাই বলেন।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিজেপ তায়িপ এরদোয়ানের এক মুখপাত্র জানান, কুর্দিদের ওপর চাপ বাড়াতে তারা উত্তর ইরাকের সীমান্তগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ করে আনছেন।

এই প্রসঙ্গে ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে রোববার তুর্কি প্রধানমন্ত্রী বিনআলি ইলদিরিমের বাগদাদ যাওয়ারও কথা আছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য