মাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর থেকেঃ দিনাজপুরের বীরগঞ্জ ও কাহারোলর ৪ শিক্ষার্থী প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তাদের এই সাফল্যে এলাকায় আনন্দের বন্যা বয়ে গেলেও পরিবারের মাথায় একটাই চিন্তা। আর সেটা হচ্ছে অর্থ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বাবদ যে অর্থের প্রয়োজন তা জোগাড় করা এদের পরিবারের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এই মেধাবী শিক্ষার্থীদের আনন্দ হতাশায় পরিণত হয়েছে। তারা তাকিয়ে আছেন সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি বা সরকারের সহযোগিতার দিকে।

রুনা আক্তার বীরগঞ্জ উপজেলার ঝাড়বাড়ি প্রসাদপাড়া বাজার গ্রামের নুর ইসলামের মেয়ে। এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিটে পরীক্ষা দিয়ে ১৭৫৪তম স্থান অধিকার করেছেন। গ্রামের আর দশ জন মেয়ের মতো স্বাভাবিক জীবন ছিল না রুনার। প্রতিনিয়ত অভাব-অনটনের মধ্যে তার বেড়ে ওঠা। দুই বেলা দু’মুঠো খেতে পারাটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সেই প্রতিকুল অবস্থায় পড়ালেখা করেই আজ সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

রুনার বাবা নুর ইসলাম পেশায় একজন চা বিক্রেতা। ছেলে সন্তান না থাকায় মেয়ে রুনাই দোকানের বিভিন্ন কাজে বাবাকে সাহায্য করত। ভবিষ্যৎ স্বপ্ন বা ইচ্ছার কথা জানতে চাইলে রুনা জানায়, বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশের সেবা করতে চাই।

একই উপজেলার শতগ্রাম ইউনিয়নের পালপাড়া গ্রামের লেবু পালের ছেলে উদ্ভব পাল। এসএসসি কিংবা এইচএসসি কোনোটিতেই জিপিএ-৫ নেই। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে পড়তেই হবে। এটা তার স্বপ্ন নয় বিশ্বাস। অবশেষে ‘খ’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ২১১৩তম স্থান নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন উদ্ভব।

উদ্ভবের বাবা পেশায় কুমার। মাটির হাড়ি-পাতিল বিক্রি করে ছেলের ভর্তি ফিস জমা করা সম্ভব না। তাই সকলের সাহায্য কামনা করেন উদ্ভবের বাবা লেবু পাল ও মা শ্রীমতি পাল।

বীরগঞ্জ উপজেলার আরেক মেধাবী শিক্ষার্থী মো. সুমন ইসলাম ‘খ’ ইউনিট থেকে ২২৪৩তম স্থান নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। সুমন ইসলাম পাল্টাপুর ইউনিয়নের সাদুল্যাহ পাড়ার মো. বজলুর রহমানের ছেলে। সংসারে বাবা থাকতেও নেই। পরিবারের সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন।

মা রহেদা বেগম চাতাল শ্রমিক। মাকে সহযোগিতা করতে ও নিজের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য মাঝে মাঝে স্কুুল-কলেজ না গিয়ে তাকে কৃষি শ্রমিকের কাজ করতে হয়। মা আর চার ভাই বোন নিয়ে তাদের সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে। যেখানে সংসার চলাই দায় সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার চিন্তা তাদের কাছে আকাশ-কুসুম ল্পনা। তারা এখন চেয়ে আছেন সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দিকে। কারো সহযোগিতা না পেলে সুমনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

একই ইউনিয়নের ঘোড়াবান্দ গ্রামের বাসিন্দা মো. হাছিনুর রহমান। ভ্যানচালক সমাজ উদ্দীনের ছেলে হাসিনুর এবার ‘খ’ ইউনিট থেকে ৭৪৮তম স্থান নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। বাবা অসুস্থ হওয়ার কারণে এখন ভ্যান চালাতে পারেন না। হাছিনুরই মানুষের বাড়িতে কামলার কাজ করে খেয়ে পরে বেঁচে আছে।

তাঁর পরীক্ষার যাবতীয় খরচও দিয়েছেন এক প্রতিবেশী। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে শিক্ষা জীবন চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিত্তবান ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সহযোগিতার আশায় অপেক্ষায় রয়েছেন হাছিনুর ও তার পরিবার। তার বিশ্বাস কেউ না কেউ তাকে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসবেনই।

তারা জানায়, আগামী ২৪ অক্টোবর ভর্তির শেষ সময়। ভর্তি হতে অনেক টাকা লাগবে যেখানে তাদের সংসার চলান দায়। তাই স্বপ্ন পূরণে জেলার বিত্তবান ও হৃদয়বানদের সহযোগিতা কামনা করেছেতারা।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য