বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সেই দিনমজুর মেধাবী ছাত্র মোহাম্মদ আলীর লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

‘অর্থ অভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ হারাচ্ছে কাহারোলে’র আলী’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হয়। সংবাদটি প্রকাশের পর কাহারোল উপজেলা প্রশাসন মোহাম্মদ আলীকে খুঁজে বের করে তার লেখাপড়ার দায়িত্ব নেয়।

গতকাল মঙ্গলবার ভর্তির জন্য তাকে নগদ আর্থিক সহায়তা করা হয়।

দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাসিম আহমেদ জানান, যুগান্তরে কাহারোল উপজেলার মেধাবী ছাত্র মোহাম্মদ আলীর সংবাদটি প্রকাশ হওয়ার পর দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলমসহ উপজেলা প্রশাসনের সংবাদটি দৃষ্টিগোচর হয়। এরপর জেলা প্রশাসকের নির্দেশেই তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য মঙ্গলবার আর্থিক অনুদান দেয়া হয়। এ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়ার জন্য তার এক বছরের খরচ চালানো হবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে।

ইউএনও মো. নাসিম আহমেদ জানান, মোহাম্মদ আলীর লেখাপড়ার দায়িত্ব নেয়ার পাশাপাশি তার দিনমজুর মা মসলিমা বেগমের ভরণ-পোষণেরও দায়িত্ব নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে।

মোহাম্মদ আলী দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার ১নং ডাবোর ইউনিয়নের ডহচী গ্রামের মৃত আবদুর রহিমের ছেলে। ভিটেমাটি না থাকায় তারা আশ্রয় নেন কাহারোল উপজেলার ডহচী মধুহারী আশ্রয়ণ প্রকল্পে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় মোহাম্মদ আলীর বাবা মারা যান।

তখন মা মসলিমা বেগম অন্যের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করে সংসারের হাল ধরেন। এভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করেন মোহাম্মদ আলী।

মোহাম্মদ আলী জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষ করার পর স্থানীয় জয়নন্দ এসসি উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করে দেয় মা। মনে করলাম, ভালো করে পড়াশোনা করে এসএসসিতে ভালো ফলাফল করতে হবে।

কিন্তু আমাদের সংসারে বিবাহযোগ্য বড় বোন আছে। তাকে বিয়ে দেয়ার জন্য ‘মা’ খুবই টেনশন করতেন প্রায়ই সময়। একাই দিনমজুরি করে কীভাবে বোনকে বিয়ে দেবে সেই চিন্তায় মগ্ন থাকতেন তিনি। তাই সপ্তম শ্রেণি থেকে মায়ের সঙ্গে দিনমজুরের কাজ শুরু করে মোহাম্মদ আলী। সপ্তাহে দুই দিন স্কুলে যেত আর নিয়মিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করত মেধাবী ওই ছাত্র।

অবশেষে মা-ছেলের উপার্জিত টাকায় ৫ বছর আগে বোন রওশন আরার বিয়ে দেয়া হয়। এরপর মায়ের দুশ্চিন্তা তখন কিছুটা কমে আসে।

পরে ২০১৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে ৪.৯৪ জিপিএ পয়েন্ট নিয়ে উত্তীর্ণ স্থানীয় জয়নন্দ ডিগ্রি কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হয় মোহাম্মদ আলী। কিন্তু জীবন নির্বাহের জন্য দিনমজুরের কাজ ছাড়তে পারে নাই।

মোহাম্মদ আলী জানান, সারাদিন মাঠে, ক্ষেত, খামারে কাজ করে রাত জেগে পড়াশোনা করতাম। ইচ্ছে ছিল ভালো করে পড়াশোনা করলেই একমাত্র জীবন সংগ্রামের পরিবর্তন হতে পারে। এরপর ২০১৭ সালে জয়নন্দ ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় ৪.৮৩ জিপিএ পয়েন্ট নিয়ে উত্তীর্ণ হই।

অনেক বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিং করার জন্য ঢাকা শহরে পাড়ি জমায়। আমারও ইচ্ছে ছিল, কিন্তু উপায় ছিল না। হঠাৎ একদিন মনে হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করতে পারলে আমার জীবনে পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু সাধ থাকলেও সাধ্য নেই।

সেই স্বপ্ন নিয়ে এলাকার এক ভাইয়ের কাছে পরামর্শ নেই। ফরম কেনার টাকাও ছিল না। এরপর স্থানীয় কিছু দানশীল ব্যক্তি ও কলেজের শিক্ষকের সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফরম পূরণ করি এবং ঢাকায় গিয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য গত ২২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘খ’ ইউনিটে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি।

২৫ আগস্ট ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল হওয়ার পর দেখি ‘খ’ ৬৬৮ সিরিয়াল। ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। আগামী ২৪ অক্টোবর তার ভর্তির শেষ তারিখ। এজন্য তিনি সমাজের স্থানীয় দানশীল ব্যক্তি ও শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

মোহাম্মদ আলী জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চান্স পেয়েও অর্থের অভাবে ভর্তি হতে পারবে কি না-এ বিষয়ে সে ছিল দুশ্চিন্তায়। কিন্তু যুগান্তরে তার খবরটি প্রকাশের পর উপজেলা প্রশাসন ভর্তির টাকাসহ এক বছরের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন।

এজন্য তিনি উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি যুগান্তরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য