আইসো বাহে বৈতত যাই। গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার এই আঞ্চলিক ভাষা প্রতিদিন সুর্য্য উঠার সাথে সাথেই মুখরিত হয়ে উঠে পল্লী গ্রামে। পেশা ও নেশাদার মাছ শিকারী লিডাররা ঘুম থেকে জেগে উঠেই বিকট শব্দে চিৎকার করে ডাকতে থাকে “আইসো বাহে বৈদত যাই”। লিডারদের ডাকে সারা দিয়ে একত্রে জড়ো হয় মাছ শিকারীদল।

তারা মাথায় গামছা, পলিথিনে মোড়ানো বিড়ি-ম্যাচ কোমড়ে বেধে আর ঘারে পলো নিয়ে ছুটতে থাকে মাছ ধরতে। মাছ শিকারী দীর্ঘ পথ পায়ে হেটে পুর্ব ঘোষিত খাল-বিলের গলা পানিতে নেমে মাছ ধরা শুরু করেন। এভাবে শুরু হয় মাছধরার মহাৎসব। সম্প্রতি সাদুল্যাপুর উপজেলার বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় বিভিন্ন নদ-নদী ও খাল বিলে শুরু হয়েছে মাছ ধরার মহাৎসব।

সাদুল্যাপুর অঞ্চলের কয়েকজন বৈতাল (মাছ শিকারী) বলেন, এ এলাকার হাওর খাল বিল সহ উন্মুক্ত জলাশয়ে কয়েকদিন পূর্ব থেকেই দিন তারিখ ঠিক করে নির্দিষ্ট দিনে বেলা বাড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন গ্রাম থেকে সৌখিন মৎস শিকারীরা নির্দিষ্ট জায়গায় এসে জড়ো হয়। জলাশয়ের এক প্রান্ত থেকে সকলে একই সাথে লাইন ধরে লুঙ্গী আটঘাট করে বেধে অথবা কাছা মেরে এক সঙ্গে দল বেধে নান্দনিক ছন্দের প্রতিযোগিতা মূলকভাবে পলো দিয়ে মাছ ধরা শুরু করেন। ক্রমান্বয়ে সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে যান সামনের দিকে। চলতে থাকে পলো দিয়ে পানিতে একের পর এক চাপ দেওয়া আর হৈ হুল্লুড় করে সামনের দিকে অঘোষিত ছন্দের তালে তালে ঝপ ঝপাঝপ শব্দে এগিয়ে যাওয়া।

যেন এক নিজস্ব চিরচেনা গ্রামবাংলার অপরূপ সৌন্দর্যময় দৃশ্য। পলো নিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষের উপস্থিতি ও হৈ হুল্লুড়ের কারণে জলাশয়ের পানিতে তুমুল নড়াচড়ায় জলকম্পনে শুরু হয়। এতে মাছেরা দিশেহারা হয়ে আত্মরক্ষার্থে দিগি¦দিক ছুটাছুটি শুরু করে দেয়ায় ঝাকে ঝাকে মাছ ধরা পড়ে। কোন কোন সময় মাছ দিশেহারা হয়ে লাফ দিয়ে শুকনোতেও উঠে যায়। মহড়া চলাকালীন কারো পলোতে মাছ লাগলেই মাছ পলোর ভেতর নাড়া দেয়। এতে বুঝা যায় শিকার এবার হাতের মুঠোয়। তখন পলোটিকে কাদা মাটির সাথে ভালোভাবে চাপ দিয়ে ধরে নিচের কোন দিকে ফাঁক না থাকে। কারণ ফাঁক থাকলে সেদিক দিয়ে শিকার হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। এরপর উপরের খোলা মুখ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে মনের আনন্দে ধরে আনা হয় মাছটিকে।

মাছ শিকারী মোখলেছার রহমান ও বজলু মিয়া জানান, বর্তমানে অনেক হাওর খাল বিল ও উন্মুক্ত জলাশয় ভরাট কিংবা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও কিছুটা জলাশয় থাকলেও আগের মতো মাছ পাওয়া যায়না এবং আগের অনেক প্রজাতির মাছ বর্তমানে বিলুপ্ত প্রায়। বর্তমানে যেটুকু অবশিষ্ট আছে এর বেশির ভাগ জলাশয় লাটিয়াল বাহিনী পেশি শক্তির বলে দখল করে নিয়েছে অথবা ব্যক্তিগতভাবে কলে কৌশলে বৈধ বা অবৈধভাবে কব্জা করে কাউকে সেখানে নামতে দিচ্ছেনা। উন্মুক্ত জলাশয়ের মাছের স্বাদ ফার্মের মাছে পাওয়া যায়না। কথায় বলে ‘‘মাছে ভাতে বাঙালী’’।

বাঙালীরা কয়েকদিন মাছ না খেলে মন আকুবাকু করে। কারণ এতে বাঙালীদের একটা নাড়ীর টান রয়েছে। বর্তমানে মাছ কিনতে বাজারে গেলে মাছের দাম শুনে আৎকে উঠতে হয়। উন্মুক্ত জলাশয়ের সুস্বাদু মাছতো পাওয়াই যায়না বরং ফার্মের মাছই একমাত্র ভরসা। তারা আরও বলেন এমন এক দিন আসবে হয়তো উন্মুক্ত জলাশয়ে পলো দিয়ে মাছ ধরা শুধু স্মৃতি হয়েই রবে অথবা আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো চিনবেইনা পলো দিয়ে কিভাবে মাছ ধরতে হয়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য