মাসুদ রানা পলক, ঠাকুরগাঁও থেকেঃ ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ভেলাজান ভেলাপুকুর গ্রামের বাসিন্দা। হাজী ইউনুস আলী বয়স ৭০। হঠাৎ রবিবার বিকেলে আমার নিজ কক্ষে আগুন জ্বলে উঠে। পরে পরিবারের লোকজন পানি দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনে।

এতে আমার পাঞ্জাবিসহ কয়েকটি কাপড় চোপড় আশিংক পুড়ে যায়। হঠাৎ এই আগুনে আতংকিত হয়ে পড়ে ইউনুস আলী ও তার পরিবারের সদস্যরা। তার ১ ঘন্টা পরে আবারো অলৌকিক ভাবে ওই এলাকার তিনটি বাড়ির ঘরের ভেতরে আগুন জ্বলে উঠার ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি জানান।

রবিবার রাতে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা যায়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ভেলাজান ভেলাপুকুর গ্রামে হঠাৎ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় এলাকা জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

তিনটি বাড়িতে জামা-কাপড়ে অলৌকিক ভাবে আগুন ধরেছে বলে ভুক্তভোগী পরিবার গুলো জানিয়েছেন। হঠাৎ এই ভুতুরে আগুন নিয়ে সবাই যেন নির্বাক।

কিভাবে হচ্ছে, কে করছে, এ যেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এমন ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পরিবারসহ গোটা এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ভূক্তভোগী পরিবারের নারী, পুরুষ, পুত্র, কন্যা সবাই বাড়িঘর পাহাড়া দিচ্ছে। কখন কোথায় আগুন জ্বলে ওঠে তা নেভাতে সকলকে সতর্ক অবস্থায় থাকতে হচ্ছে।

তিনটি বাড়ির ঘরের কাপড়-চোপড়, বিছানা, পাঞ্জাবীসহ কাপড়ের আংশিক কিংবা অর্ধেক পুড়ে গেছে। সেই কাপড়গুলি বাইরে আঙ্গিনায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রাখতে দেখা গেছে। যে কাপড়গুলো ভাল রয়েছে তা পুড়ে যাওয়ার ভয়ে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে।

ভূক্তভোগী ইউনুস আলীর (৭০) কাছে অলৌকিক আগুনের ঘটনার বিবরণ জানতে চাইলে তিনি জানান, গত ঈদের পরে আমার ও ভাতিজার বাড়িতে হঠাৎ দু’একটা করে ইট, পাথর পড়ে। গত ১৫ দিন আগে একটি ইটের টুকরো আমার বউমার সামনে পড়ে। বউমা আবার সেই ইটের টুকরো পাল্টা ছুড়ে মারে। ইটের টুকরো ছুড়ে মারার কিছুক্ষন পরে সে (বউমা) অজ্ঞান হয়ে যায়।

পরে এক কবিরাজকে ডেকে আনলে বলে জিনের আসর ধরেছে। ঝাড়ফুক করে সুস্থ হয়ে উঠে বউমা। ওইদিন থেকে আমরা মাহাত, মুন্সি দেখা দেখি করি। পরে ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি নামক এলাকার ক্বারী আফাজদ্দিন নামে এক মুন্সিকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে গেলে বাড়িতে বেশ কাজ-কাম আযান (কুফরী কালাম) করে দিয়েছিল। ওই মুন্সি আরো বলেন ৭দিন পর আবার কিছু কুফরী কালাম করে বাড়ি বন্ধ করতে হবে। গত শুক্রবার থেকে ৭দিন পূর্ণ হয়ে গেছে। গতকালকে ওই ক্বারী মুন্সিকে বাড়ি বন্ধের জন্য আসতে বললে সে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন বলে তিনি জানান।

কিন্তু গতকাল শনিবার বিকেল ৫টায় আমার নাতি সিদ্দিকুরের বাড়িতে হঠাৎ ঘরের কাপড়ে আগুন ধরে। লোকজন টের পেলে পানি দিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলে। ঠিক একই ভাবে আমার ভাতিজার বাড়ির ঘরে আজ রবিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে কাপড়-চোপড়ে আগুন ধরে যায়। আবার নিভিয়ে ফেলে তারা। তখন বাড়ির কাপড় চোপড় সব বাড়ির বাইরে রেখে দেওয়া হয়। তারপরেও সেই কাপড় গুলোতে হঠাৎ আগুন ধরে আংশিক জ্বলে উঠছে আবার নিভেও যাচ্ছে।

এর ঘন্টা খানেক পর আর এক নাতির বাড়িতে কাপড়-চোপড় ও আসবাপত্রে আগুন ধরেছে বলে আমি শুনে দেখতে যাই। তারপরে আবার শুনি আমার বাড়িতেও আগুন ধরেছে। সবাই ছুটে এসে আগুন নিয়ন্ত্রনের আনি। এতে আমার পাঞ্জাবি ও কিছু কাপড় পুড়ে যায়। সবকিছুই অদৃশ্য। বিষয়টি নিয়ে গ্রামবাসীসহ সকলে আমরা আতংকিত।

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য যাদের কাপড়ের আংশিক কিংবা অর্ধেক পুড়ে গেছে তারা জানায়, ওই মহিলা ইট পাটকেল ছুড়ে মারার ১৫ দিন পর এই অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটলো। কেউ হয়তোবা কুফরী করে এসব চালনা করছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ওই এলাকার সমাজসেবক মাসুদ রানা বাবুল জানান, আমি একটি প্রাইভেট ব্যাংকে চাকুরি করি। গতকাল অলৌকিক আগুনের কথা শুনে বিশ্বাস হয়নি আমার। বর্তমান বিজ্ঞান প্রযুক্তির যুগে আবার ভূতুরে আগুনের খবর হাস্যকর মনে হয়েছে আমার। সন্ধ্যায় এলাকায় যখন আগুনের কথা জানতে পারি ছুটে আসি ঘটনাটি জানার জন্য। এসে দেখি সত্যিই অলৌকিক ভাবে কাপড়-চোপড়ে আগুন ধরে আংশিক পুড়ে গেছে, আবার নিভে যাচ্ছে। অবাক হয়েছি ঘটনাটি চোখের সামনে দেখে। এতে করে ওই এলাকায় প্রায় শতাধিক পরিবার ভুতুরে আগুন নিয়ে বাড়তি সর্তক অবস্থানে রয়েছে। কখন যে আবার কার ঘরে আগুন ধরে।

ভেলাপুকুর গ্রামের নাজিম উদ্দিন জানান, আগুনের ভয়ে ঘরে যেতেই ভয় লাগছে। এই অদৃশ্য আগুনের ঘটনাটির কারণ আমরা কেউ বের করতে পারছি না।

ঠাকুরগাঁও শহরের কালী বাড়ি এলাকার ক্বারী আফাজউদ্দিন মুন্সির সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, ভেলাপুকুর গ্রামে অলৌকিক জিনের ইটের টুকরা পড়লে, এক মহিলা পাল্টা ওই ইটের টুকরো ছুড়ে মারার পর ঘটনার সূত্রপাত। ওই বাড়িতে জিনের আসর ধরেছে। জিনটিকে বন্দি করতে হলে বাড়িটি কুফরি-কালামের কাজ করতে হবে। আমি অসুস্থতার কারণে যেতে পারি নাই।

ঠাকুরগাঁও ফায়ার সাভির্সের উপ-পরিচালক আনিসুর রহমানের কাছে ভেলাজান ভেলাপুকুর এলাকার আগুনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ ওই এলাকায় আগুনের বিষয়ে আমাদেরকে অবগত করেনি।

ঠাকুরগাঁও কেদ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম খলিলুর রহমানের কাছে অলৌকিক আগুনে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মানুষের জন্য মমত্ববোধ সৃষ্টির উৎস যিনি, তিনিইতো পরম অনুগ্রহনশীল রহমান খোদা। দআল্লাহ তাদলা আকাশ সমূহ এবং পৃথিবীর নূরদ পৃথিবীর আলোকমালায় জ্যোতির্ময় উৎস। মহাবিশ্বের এই নিপূন স্থপতির অলৌকিক নির্মানশৈলী আমাদের এ পৃথিবী। তিনিই সবই কিছুই করতে পারেন বলে ব্যক্ত করেন।

ঠাকুরগাঁও সিভিল সার্জন ডা: আবু মো: খায়রুল কবিরের কাছে অলৌকক ছোট ইটের টুকরোর কারনে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে এমনি প্রশ্ন করলে তিনি জানান, চিকিৎসা বিজ্ঞানে অলৌকিক বলতে কিছুই নেই। মানুষ ভয় বা আতংকিত হয়ে অজ্ঞান হতে পারে বলে তিনি জানান।

ভূক্তভোগী পরিবারগুলো ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকসহ সকলের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেছেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য