স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার ও সাংবিধানিক আদালতকে উপেক্ষা করে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে ভোট দিচ্ছে কাতালোনিয়ার জনগণ। রোববার সকাল ৯টা থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কিছু কেন্দ্রে আগেই ভোট শুরু হয়ে যায় বলে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

কাতালান আঞ্চলিক সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন, কেন্দ্রে কেন্দ্রে যথেষ্ট পরিমাণ ব্যালট ও বাক্স প্রস্তুত আছে; তারা বিপুল পরিমাণ ভোটারের উপস্থিতিও প্রত্যাশা করছেন। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভোট শুরুর পর পুলিশ বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ব্যালট পেপার ও বাক্স জব্দ করা শুরু করেছে।

দাঙ্গা পুলিশ অন্তত একটি কেন্দ্র থেকে ভোটারদের সরিয়ে দিলেও বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে লাইন ধরে ভোটাররা তাদের রায় জানাচ্ছে বলে খবর বিবিসির। কাতালান আঞ্চলিক সরকারের নেতা কার্লোস পুজদেমন যেই স্পোর্টস সেন্টারে ভোট দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন গিরোনার কাছে সেই কেন্দ্রে ঢুকে ভোট বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ।

টিভি ফুটেজে তাদের তছনছের দৃশ্য দেখা গেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স; এসময় বাইরে থাকা কাতালানরা স্বাধীনতার সমর্থনে গান গাইতে থাকে। কিছু কিছু এলাকায় কৃষকরা তাদের ট্রাক দিয়ে সড়ক ও ভোটকেন্দ্রের আশপাশ ঘিরে দিয়েছে যেন পুলিশ সহজে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে। ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এমন অসংখ্য স্কুলের প্রধান ফটকও সরিয়ে রাখা হয়েছে, যেন চাইলেও ভবনগুলো আটকে দিয়ে ভোট বন্ধ না করা যায়।

ভোট শুরুর আগে কাতালান সরকার জানিয়েছে, যেসব এলাকার ভোটকেন্দ্র পুলিশ দখলে নিয়ে নেবে সেসব এলাকার ভোটাররা অন্য যে কোনো কেন্দ্রে তাদের রায় জানাতে পারবে। “সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছি, কারণ আমাকে দেশের প্রয়োজন,” বার্সেলোনার একটি স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে এমনটাই বলেন ৬৫ বছর বয়সী ইউলিয়া এসপিনা তারো। ভোট নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও সহজে ফিরছেন না তিনি। “জানি না কি হবে, তবে আমাদের এখানেই থাকতে হবে।”

ভোটের ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা ব্যক্ত করেছেন কাতালান আঞ্চলিক সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ওরিও জেনকুয়েরা। “রোরবার গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিন হতে যাচ্ছে,” চ্যানেল টিভি থ্রি-কে দেওয়া মন্তব্যে এমনটাই বলেন তিনি।

এর আগে রোববার ভোর থেকে বার্সেলোনার বেশ কয়েকটি স্কুলের বাইরে ভোটারদের লাইনে দাঁড়াতে দেখা গেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। স্পেনের কেন্দ্রিয় সরকার কাতালোনিয়ার এই গণভোটকে ‘সাংবিধানিকভাবে অবৈধ’ অ্যাখ্যা দিয়ে যে কোনো মূল্যে তা বন্ধের হুংকার দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অতিরিক্ত কয়েক হাজার পুলিশ এনে বার্সেলোনা ও অন্যান্য শহরে মোতায়েন করা হয়েছে।

রোববার সকালে ৩০টি ভ্যান, বিভিন্ন আকারের যানবাহন ও ট্রাকভর্তি সিভিল গার্ড পুলিশ সদস্যদের বার্সেলোনার বন্দর ছাড়তে দেখা গেছে। শহরজুড়ে দেখা গেছে অসংখ্য পুলিশ। শনিবার পুলিশ কাতালোনিয়ার আঞ্চলিক সরকার যে স্কুলগুলোকে ভোট কেন্দ্র বানিয়েছে সেগুলোর বেশিরভাগই বন্ধ করে দেয়।

ভোট নিশ্চিতে আগের দিন থেকে স্বাধীনতাকামীরা অনেক স্কুল দখলে রেখেছিল।এমনকি স্কুলের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাও শুক্রবার স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ার পরও সেখানেই থেকে গেছেন। কেন্দ্রীয় সরকার পুলিশকে স্কুলগুলো খালি করে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশ পরে আঞ্চলিক সরকারের টেলিযোগাযোগ কেন্দ্রেরও দখল নেয়। কাতালান আঞ্চলিক পুলিশ কর্মকর্তাদের স্পেনের জাতীয় পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার আদেশ দেওয়া হলেও তারা মাঠে নামেনি বলে জানায় বিবিসি।

ব্যালট পেপারসহ ভোটের অন্যান্য সরঞ্জামও জব্দ করছে পুলিশ। অনলাইনে গণভোটের প্রচার চলানো হচ্ছে এমন লিংক বন্ধ করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সম্পদশালী কাতালোনিয়ার স্বায়ত্বশাসন আছে; যদিও এর সরকার বলছে, জনগণ স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা চায়। সেখানে প্রায় ৭৫ লাখ মানুষ বসবাস করে; তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি আছে। গণভোট আয়োজনে এ মাসের শুরুর দিকে কাতালান পার্লামেন্ট নতুন একটি আইন পাশ করে, যাতে স্থগিতাদেশ দেয় স্পেনের সাংবিধানিক আদালত।

এরপরও কাতালান সরকার যথাসময়ে গণভোট আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে থাকলে তাদের থামাতে বল প্রয়োগ শুরু করে মাদ্রিদ; শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড় ও তল্লাশি অভিযান। কাতালান আঞ্চলিক সরকার বলছে, গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে রায় এলে তা বাস্তবায়নে প্রক্রিয়া শুরু করবে তারা। অন্যদিকে কাতালানরা অন্যান্য অঞ্চলের থেকে বেশি স্বায়ত্বশাসন পেয়ে আসছে দাবি করে মাদ্রিদের সরকার বলছে, স্পেনের সংবিধানে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। অখণ্ডতা রক্ষায় সব করা হবে বলেও বারবার বলে আসছে তারা।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য