দিনাজপুর সংবাদাতাঃ শারদীয় দুর্গোৎসবের মহা অষ্টমীতে দিনাজপুর রামকৃষ্ণ আশ্রম ও মিশনে আরতি, অঞ্জলী দান ও প্রসাদ বিতরনের মধ্যদিয়ে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ বছরের ‘কুমারী দেবী’ হিসেবে নির্বাচিত হয় সেন্ট যোসেফ স্কুলে পড়ুয়া ৭ বছরের শিশু কন্যা ‘উজ্জয়ী ব্যানার্জী’।

সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী সব নারীর মধ্যে মাতৃরূপ উপলব্ধি করতেই এ পূজার আয়োজন হয়। সাধারণত ১৬ বছরের কম বয়সী কন্যা শিশুদের মধ্যে থেকে ‘দেবীত্বের লক্ষণ বিচার করে’ কুমারী নির্বাচন করেন পুরোহিতরা। শাস্ত্রমতে তার একটি নামও দেওয়া হয়।

২৮ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার সকাল ১১ টায় দিনাজপুর রামকৃষ্ণ আশ্রম ও মিশনে কুমারী পূজা শুরু হয়। এর আগে কুমারী কন্যাকে স্নান করিয়ে নতুন পোশাক, ফুলের মালা ও অলঙ্কারে সাজানো হয় দেবীরূপে। এবারের ‘কুমারী’ দিনাজপুর শহরের গুড়গোলা এলাকার পিতা উৎপল ব্যানার্জী ও মাতা ববি ব্যানার্জী’র শিশু কণ্যা উজ্জয়ী ব্যানার্জী। শাস্ত্রমতে এবারের ‘কুমারী দেবী’র নাম রাখা হয় ‘মালিনী’।

ঘড়ির সময় ঠিক ১১টায় ‘দুর্গা মা-ই কি, জয়’ ধ্বনিতে পূজা শুরু করেন পুজারী সঞ্জয় চক্রবর্তী। তার সঙ্গে ‘তন্ত্রধারক’ ছিলেন স্বামী নামামৃতানন্দ মহারাজ। এসময় ভক্তরা ‘কুমারী দেবীর’ চরণে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে প্রাণিকূলের কল্যাণ ও মঙ্গল কামনা করেন।
শুরুতেই গঙ্গাজল ছিটিয়ে ‘কুমারী দেবী’কে পরিপূর্ণ শুদ্ধ করে তোলা হয়। এরপর তার পা ধুয়ে নিবেদন করা হয় অর্ঘ্য। কুমারী পূজার ১৬টি উপকরণ দিয়ে শুরু হয় পূজার আচার। এরপর অগ্নি, জল, বস্ত্র, পুষ্প ও বাতাস্ত এই পাঁচ উপকরণে দেওয়া হয় ‘কুমারী মায়ের’ পূজা।

অর্ঘ্য নিবেদনের পর দেবীর গলায় পরানো হয় পুষ্পমাল্য। পূজা শেষে প্রধান পূজারি আরতি দেন এবং তাকে প্রণাম করেন। সবশেষে মন্ত্রপাঠ করে ভক্তদের মাঝে প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে বেলা সাড়ে ১১টায় শেষ হয় কুমারী পূজা।

ভক্তদের পূজা গ্রহণ শেষে বিশ্রামঘরে বসে ‘কুমারী’ উজ্জয়ী ব্যানার্জী সাংবাদিকদের বলেন, “সবাই আমাকে পূজো দিয়েছে, খুবই ভালো লাগছে। আমি সবাইকে আশীর্বাদ করেছি, যেন তারা ভালো থাকে।”

উজ্জয়ী ব্যানার্জী’র মা ববি ব্যানার্জী বলেন, “আমার মেয়ে দেবীরূপে আবির্ভূত হয়েছে। বড় হয়ে আমার মেয়ে দেবীর মতোই অসুরবিনাশী কাজ করে পৃথিবীর মঙ্গল করবে।”

পূজা শেষে দিনাজপুর রামকৃষ্ণ মিশন ও আশ্রম এর অধ্যক্ষ স্বামী অমেয়াত্মানন্দজী মহারাজ বলেন, মহা অষ্টমী হলো দুর্গোৎসবের সেই মুহূর্ত, যখন অকল্যাণের প্রতীক মহিষাসুর বধকা- চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। এই তীথিতেই শুদ্ধাত্মা দেবী দুর্গার প্রতীক হিসেবে কুমারী কন্যাকে মাতৃরূপে অঞ্জলী দেয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা, যার নাম কুমারী পূজা। সাধারণত ১৬ বছরের কম বয়সী কন্যা শিশুদের মধ্যে থেকে ‘দেবীত্বের লক্ষণ বিচার করে’ কুমারী নির্বাচন করেন পুরোহিতরা।

দিনাজপুর রামকৃষ্ণ আশ্রম ও মিশন পরিচালনা কমিটির সভাপতি সত্য নারায়ন আগারওয়ালা সাংবাদিকদের বলেন, কাশ্মীরে এক নৌকায় মুসলিম কন্যাকে দিয়ে প্রথম কুমারী পুজা শুরু করেন স্বামী বিবেকানন্দ। তারপর থেকেই রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন গুলোতে প্রায় ১শ বছরের অধিক সময় ধরে করা হয় কুমারী পুজা। আর দিনাজপুর রামকৃষ্ণ আশ্রমে দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই কুমারী পুজা হয়ে আসছে। প্রতি বছর পুজায় প্রায় ৭-৮ হাজার ভক্তবৃন্দ উপস্থিত হয় এই আশ্রম ও মিশনে এবং তাদের প্রত্যেকের মাঝে প্রসাদ বিতরন করা হয়।

দিনাজপুর রামকৃষ্ণ আশ্রম ও মিশনের বিশেষ দিক উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এখানে দেশ, জাতি ও পৃথিবীর সমস্ত মানুষের কল্যান কামনা করে বিশেষ প্রার্থনাও করা হয়।

কুমারী পুজা দেখতে আসা শুক্লা সাহা বলেন, নারী শক্তি জাগ্রত করা এবং মেয়েদের প্রতি সম্মান যাতে আরো বাড়ে এজন্য সকল মেয়েকে ইঙ্গিত করে এই কুমারী পুজা করা হয়। আর দিনাজপুর রামকৃষ্ণ আশ্রমের কুমারী পুজা অনেক জাকজমকপুর্ন ভাবে অনুষ্ঠিত হয়। তাই আমি প্রতি বছরই এই আশ্রমে কুমারী পুজা দেখতে আসি।

এদিকে কুমারী পূজা সুষ্ঠুভাবে পালনের ক্ষেত্রে বিপুল সংখক আইনশ্ঙ্খৃলা বাহিনীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য