বিশ্বের প্রতি দশ জন স্কুলশিশুর মধ্যে ছয়জন কার্যত কিছুই শিখছে না; অবিশ্বাস্য এই পরিস্থিতিকে জাতিসংঘ চিহ্নিত করেছে ‘শিক্ষণ সঙ্কট’ হিসেবে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাব সাহারান আফ্রিকা আর যুদ্ধ বিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোসহ গরিব দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মনোযোগ থাকে বেশি সংখ্যায় শিশুকে স্কুলে পাঠানোর দিকে।

কিন্তু ওই শিশুদের একটি বড় অংশ যে শিক্ষার ন্যূনতম মানে পৌঁছাতে পারছে না, তা উঠে এসেছে ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিসটিকসের সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।

ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাতশ কোটি মানুষের এই পৃথিবীতে ৬০ কোটির বেশি স্কুলপড়ুয়া শিশু সাধারণ গাণিতিক সমস্যার সমাধান, এমনকি ঠিকমত পড়তে পাড়ার দক্ষতাও অর্জন করতে পারছে না।

সাব সাহারান আফ্রিকায় ৮৮ শতাংশ শিশু-কিশোর ঠিকমত পড়তে পারার দক্ষতা ছাড়াই প্রাপ্তবয়স্কের জীবনে প্রবেশ করছে।

মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ৮১ শতাংশ শিশু ঠিকমত সাক্ষরতা অর্জনের আগেই স্কুল শেষ করছে।

ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিসটিকস সতর্ক করে বলেছে, এ পরিস্থিতিতে যে কোনো দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি থমকে যেতে পারে।

উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে অল্প বয়সে স্কুল ছেড়ে দেওয়া শিক্ষার্থীর হার ১৪ শতাংশের মত। কিন্তু এই মুহূর্তে বিশ্বে যত শিশু স্কুলে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ এসব উন্নত দেশের বাসিন্দা।

শিক্ষায় বৈষম্যের এই ভয়াবহ চিত্র দেখিয়ে ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিসটিকসের পরিচালক সিলভিয়া মনতৈয়া বলেন, “এমন নয় যে এই শিশুরা সরকারের সুবিধা বা সামাজিক আওতার বাইরে। তারা স্কুলে যাচ্ছে। শিক্ষার মান বাড়াতে আমাদের যে আরও বিনিয়োগ করা প্রয়োজন, এই গবেষণা সে কথাই বলছে।”

স্কুল পড়ুয়াদের শিখতে না পড়ার এই সঙ্কট বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদনেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে কোটি কোটি কিশোর-তরুণ যে নিম্নমানের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তাতে তারা নিম্ন আয়ের নিরাপত্তাহীন এক কাজের বাজারে আটকা পড়ছে।

বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থার এই ব্যর্থতা বিশ্বে এক নৈতিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটের ইংগিত দিচ্ছে।

কেনিয়া, তানজানিয়া, উগান্ডা, নিকারাগুয়ার মত দেশে কয়েক বছর স্কুলে যাওয়ার পরও শিশুরা সাধারণ অংক করতে পারছে না বা শুদ্ধভাবে পড়তে ব্যর্থ হচ্ছে।

গবেষকরা তাদের জরিপে যখন তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের “The name of the dog is Puppy” বাক্যটি ইংরেজি বা সোয়াহিলিতে পড়তে বললেন, তিন চতুর্থাংশ শিক্ষার্থীই বুঝতে পারেনি, ওই বাক্যের মানে কী।

৪৬ থেকে ১৭ বিয়োগ করলে কত হয়- এই অংকের সঠিক উত্তর দিতে পারেনি ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া তিন চতুর্থাংশ শিশু। আর পঞ্চম শ্রেণির অর্ধেক শিক্ষার্থী ওই অংক মেলাতে পারেনি।

জাপানের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে যেখানে ৯৯ শতাংশ শিশু লেখাপড়ায় ন্যূনতম মান উৎরে যেতে পারছে, সেখানে মালিতে সেই দক্ষতা দেখাতে পারছে মাত্র ৭ শতাংশ শিশু।

গবেষকরা বলছেন, আফ্রিকার তুলনায় ব্রাজিলের শিশুরা তুলনামূলক ভালো মানের শিক্ষা পেলেও যে গতিতে সেখানে শিক্ষার মান এগোচ্ছে, তাতে গণিতের দক্ষতায় উন্নত দেশের গড় মানে পৌঁছাতে তাদের লাগবে ৭৫ বছর।

বৈষম্য আছে বিত্তশ্রেণিতেও। ক্যামেরুনে প্রাইমারি শেষ করা মেয়েদের মধ্যে যারা গরিব ঘরের সন্তান, তাদের মাত্র ৫ শতাংশ মাধ্যমিকে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। অথচ ধনী পরিবারের মেয়েদের মধ্যে এই হার ৭৬ শতাংশ।

বিশ্ব ব্যাংকের এই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দরিদ্র দেশগুলোতে বহু শিশু স্কুলে যাচ্ছে, যেখানে শেখার পরিবেশ নেই।

বাংলাদেশ, গাম্বিয়া, রোমানিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীদের ওপর গবেষণা চালিয়ে তাদের মস্তিষ্কের গঠন ও বিকাশের ক্ষেত্রেও তারতম্য দেখতে পেয়েছেন গবেষকরা।

কোনো কোনো দেশে স্কুলপড়ুয়া শিশুরা এতটাই দারিদ্র্য আর অপুষ্টির শিকার, যে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ দারুণভাবে ব্যহত হচ্ছে, ফলে তারা শিখতে পারছে না।

ঘাটতি রয়েছে শিক্ষাদানের মানেও। গবেষকরা বলছেন, যারা স্কুলে পড়াচ্ছেন, তারা সবাই মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত নন। আবার আফ্রিকার অনেক দেশে শিক্ষকরা ঠিকমত স্কুলে যান না, কারণ তারা নিয়মিত বেতন পান না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে কি না- তা দেখার ব্যবস্থা নেই বহু দেশে। অনেক জায়গায় শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ফলাফল নিয়ে মৌলিক তথ্য পাওয়াই কঠিন।

উন্নত দেশগুলোতে যেখানে শিশুদের পরীক্ষার চাপ বেশি হয়ে যাচ্ছে কি না- সেই বিতর্ক উঠছে, সেখানে গরিব দেশগুলোতে শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হচ্ছে সামান্যই।

বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল রোমার বলেন, স্কুলপড়ুয়া বহু শিশু যে আজ বলার মত কিছুই শিখছে না, তা স্বীকার করে নিতে হবে।

“শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে এই নির্মম সত্য মেনে নিলে তারপরই আমরা উন্নতির কথা ভাবতে পারব।”

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য