মানবিক সহায়তা না বাড়ালে রোহিঙ্গাদের ভয়াবহ মানবিক দুর্যোগ থেকে বিপর্যয় সৃষ্টির আশঙ্কা জানিয়েছে জাতিসংঘ। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের পর সংস্থাটির শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের পক্ষ থেকে সোমবার এই আশঙ্কা জানানো হয়েছে।জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনের প্রধান ফিলিপ গ্রান্ডি মানবিক বিপর্যয়ের গতি বাড়ানো অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন।

নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্টে বিদ্রোহীদের হামলার পর ক্লিয়ারেন্স অপারেশন জোরদার করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তখন থেকেই মিলতে থাকে বেসামরিক নিধনযজ্ঞের আলামত। পাহাড় বেয়ে ভেসে আসতে শুরু করে বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দ। পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামগুলো থেকে আগুনের ধোঁয়া এসে মিশতে শুরু করে মৌসুমী বাতাসে। মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে নিয়ে শূন্যে ছুড়ে দেয় সেনারা। কখনও কখনও কেটে ফেলা হয় তাদের গলা। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় মানুষকে। ওই সহিংসতা থেকে বাঁচতে এ পর্যন্ত ৪ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তার অভাবে মানবেতর দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

‘অবস্থাটা এখন ভয়াবহ, এক্ষুণি যদি মানবিক সহায়তার গতি না বাড়ানো যায়, সেক্ষেত্রে আমরা একটা বিপর্যয়ের ঝুঁকির মধ্যে পড়ব।’ কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনের প্রধান ফিলিপ গ্রান্ডি। রোহিঙ্গাদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাকে স্থিতিশীলতার পথে নিতে ত্রাণ কার্যক্রমের গতি বাড়ানো অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রবিবার কক্সবাজারের কুতুপালঙ শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকে ফিলিপ গ্রান্ডি বলেন, রাখাইনের নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা পৃথিবীর সবথেকে বিপন্ন জনগোষ্ঠীর ওই মানুষেরা ট্রমায় আক্রান্ত হয়ে রয়েছে। বহু রকমরে জটিলতায় আক্রান্ত তাদের নিত্য জীবন। তিনি বলেন, ‘নিজেদের গ্রামকে চোখের সামনে পুড়ে যেতে দেখেছে তারা। পরিবারের সদস্যদের মরতে দেখেছে চোখের সামনে। অনেকেই রাখাইনে ফিরতে চান, তবে এজন্য তারা সহিংসতার অবসান কামনা করেন’।

শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে সোমবার ঢাকার এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন ফিলিপো গ্রান্ডি। তিনি বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যখন শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত বন্ধ করে দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে।

কক্সবাজার এবং বান্দরবানের যে সব জায়গায় রোহিঙ্গা শরণার্থীরা আশ্রয় নিয়েছে সেখানকার স্থানীয় বাংলাদেশিদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন ফিলিপো গ্র্যান্ডি। তিনি বলেন, যে কোনো ত্রাণ কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের কল্যাণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। “স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর বড় ধরণের চাপ তৈরি হয়েছে। সুতরাং শুধুমাত্র রোহিঙ্গাদের কথা ভাবলে চলবে না। স্থানীয়দের নিরাপত্তা, তাদের ঘরবাড়ি, জমাজমি এবং পরিবেশের বিষয়টি সমস্ত পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়া দরকার।”

ত্রাণ সাহায্যে কি পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন – এই প্রশ্নে ইউএনএইচসিআর প্রধান বলেন, ৭৪ মিলিয়ন ডলারের প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ প্রয়োজন।

মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাকে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন ইতোমধ্যে ‘জাতিগত নির্মূলের পাঠ্যপুস্তকীয় দৃষ্টান্ত আখ্যা দিয়েছে। মহাসচিব প্রশ্ন তুলেছেন দুই তৃতীয়াংশ মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হলে তাকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ ছাড়া আর কী নামে ডাকা হবে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণকে রোহিঙ্গা তাড়ানোর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও এনেছে জাতিসংঘ।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য