মাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর থেকেঃ উত্তরের শস্যভান্ডার খ্যাত ধানের জেলা দিনাজপুরে পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও বাজারে চালের দাম কমছে না। চালের দাম বৃদ্ধির ফলে বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া দিনমজুর ও মধ্যআয়ের মানুষ।

চালের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ব্যাপারে মিল মালিক ও আমদাবীকারকরা দুষছেন মুজুদদারদের। মিল মালিকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি ও আমদানি নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে চালের দাম। অপরদিকে চালের দাম বাড়ায় খুচরা ব্যবসায়ীরা দায়ী করছেন মিল মালিকদের।

এদিকে অবৈধ মুজদের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোন কার্যকরি কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি ও মজুত সত্ত্বেও জেলায় বেড়েই চলেছে চালের দাম।

দিনাজপুরের অধিকাংশ মিলগুলোতে চালের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এর পরও গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি চালের দাম ৭ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে। এখন ৫০ কেজির প্রতি বস্তা চালের দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বাড়িয়েছে মিল মালিকরা।

দিনাজপুর শহরের বাহাদুর বাজারের খুচরা চাল ব্যবসায়ী মো. আব্দুল গফুর জানান, মিলগুলোতে চাল পাওয়া গেলেও ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করছেন তারা। এক সপ্তাহ আগে ৫০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা মিনিকেট চাল মিল মালিকরা বিক্রি করেছিল ২ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা। এখন তা বিক্রি করছে ২ হাজার ৭৫০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০ কেজি বস্তার বিআর-২৮ চাল ২ হাজার ৩৫০ টাকার স্থলে ২ হাজার ৮০০ টাকা, বিআর-২৯ চাল ২ হাজার ৩০০ টাকার স্থলে ২ হাজার ৬৫০ টাকা, স্বর্ণা ২ হাজার ১০০ টাকার স্থলে ২ হাজার ৪৫০ টাকা এবং হাইব্রিড মোটা ১ হাজার ৮০০ টাকার স্থলে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করছে মিল মালিকরা।

মনসুর আলী নামে অপর এক চাল ব্যবসায়ী জানান, মিলে চাল নেই, মিল মালিকরা এমন কথা না বললেও সব মিল মালিকই একসঙ্গে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ জন্য তাদের বাধ্য হয়েই বেশি দামে চাল বিক্রি করতে হচ্ছে।

এদিকে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও এই মুহূর্তে চালের দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। যেসব ধান ব্যবসায়ী এবার বোরো মৌসুমে ধান কিনে মিল মালিকদের কাছে সরবরাহ করেছেন তারা জানান, বোরো মৌসুমে পর্যাপ্ত ধান কিনে মজুদ করেছে মিল মালিকরা।

বিরল উপজেলার ধান ব্যবসায়ী রেজাউল ইসলাম জানান, তাদের কাছে বোরো মৌসুমে এবার ৭৫ কেজির প্রতিবস্তা মিনিকেট ধান ১ হাজার ৭০০ টাকা, বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ ধান ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং হাইব্রিড মোটা ধান ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে কিনেছে মিল মালিকরা। এই হিসাবে মিলের উৎপাদন খরচসহ প্রতিকেজি মিনিকেট চাল ৩৬ টাকা, বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ চাল ৩৩ টাকা এবং প্রতিকেজি হাইব্রিড মোটা চাল ৩০ থেকে ৩২ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বর্তমানে মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল ব্যবসায়ীদের বস্তার হিসাব অনুযায়ী প্রতিকেজি মিনিকেট চাল ৫৬-৫৭ টাকা, বিআর-২৮ ও বিআর-২৯ চাল ৫১-৫২ টাকা এবং হাইব্রিড মোটা চাল কিনতে হচ্ছে ৪৫-৫৬ টাকা কেজি দরে। মিল মালিকরা তাদের বাজার থেকে ধান কেনা ও উৎপাদন খরচ ধরে বস্তার হিসাব অনুযায়ী প্রতিকেজি চাল গড়ে প্রায় ২০ টাকা বেশি দরে বিক্রি করায় বাজারে অস্বাভাবিকহারে বেড়েছে চালের দাম।

সম্প্রতি দেশে বন্যা, রোহিঙ্গা ইস্যু এবং ভারত চাল রপ্তানি করবে না এমন গুজবে অধিক মুনাফার আশায় ইচ্ছামতো চালের দাম বৃদ্ধি করেছে মিল মালিকরা। আর এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।

দিনাজপুর জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সভাপতি মোসাদ্দেক হুসেন জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে বৃদ্ধির কারণেই চালের দাম বেড়েছে। এক্ষেত্রে মিল মালিকদের কোনো কারসাজি নেই। মিলে মজুদ থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ মিল মালিকরা প্রতি বস্তা চালের দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বৃদ্ধির ব্যাপারে তিনি জানান, আমদানি মূল্য বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে চালের দাম। তিনি বলেন, মিলে যে পরিমাণ ধান রয়েছে- তা স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে। একটি মিল চালাতে যেটুকু ধানের প্রয়োজন, সেটুকু ধানই রয়েছে মিলগুলোতে।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ বাজারে চালের দাম বৃদ্ধিকে অযৌক্তিক বলে উল্লেখ করেন। চালের দাম বৃদ্ধির ব্যাপারে গত রোববার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম জানান, বাজারে চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। এ জন্য লাভ কিছু কম রেখে চাল বিক্রি করেতে মিল মালিকদের প্রতি আহবান জানান। পর্যাপ্ত চাল মজুদ নেই বলে তাঁকে অবহিত করেছে মিল মালিকরা। তবে চালকলগুলোতে তদারকির ব্যাপারে কিছু জানাননি জেলা প্রশাসক। ওই সভায় খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা, শিল্প ও বণিক সমিতির নেতৃবৃন্দ, মিল মালিকরা উপস্থিত থাকলেও সভায় সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক শাহীন হোসেন জানান, সরকার চালের আমদানি শুল্ক ২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ করায় হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে প্রচুর পরিমাণে চাল বাংলাদেশে এসেছে।

হিলি স্থলবন্দরের বেসরকারি অপারেটর পানামা পোর্ট লিংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপক অসিত কুমার জানান, হিলি স্থলবন্দর দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ভারত থেকে ১৩০ থেকে ১৫০টি করে চাল বোঝাই ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তাতে এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার টন চাল ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছে।

হিলি স্থলবন্দরের কাস্টমস সুপারিনটেনডেন্ট মো. ফখর উদ্দীন জানান, এই বন্দরের মাধ্যমে ভারত থেকে আমদানি স্বাভাবিক রয়েছে। বরং ঈদের পর থেকে বেশি চাল আমদানি হচ্ছে। বন্দরে চাল বোঝাই ট্রাক আসার সঙ্গে সঙ্গে খালাস কার্যক্রমও সম্পন্ন করা হচ্ছে। যাতে ব্যবসায়ীরা দ্রুত চাল খালাস করে তাদের গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারেন।

উল্লেখ্য, দিনাজপুর শহরের বাহাদুর বাজারে গত এক সপ্তাহ আগে মিনিকেট প্রতিকেজি চাল বিক্রি হয়েছে ৫২ টাকা। গতকাল বুধবার বিক্রি হয়েছে ৫৮-৬০ টাকা দরে। এছাড়া বিআর-২৮ চাল প্রতিকেজি ৪৮ টাকার স্থলে ৫৫ টাকা, স্বর্ণা ৪২ টাকার স্থলে ৪৭-৪৮ টাকা, হাইব্রিড মোটা ৩৭ টাকার স্থলে ৪৪-৪৫ টাকা, বিআর-২৯ চাল প্রতিকেজি ৪৬ টাকার স্থলে ৫২-৫৪ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য