আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট প্রতিনিধি: লালমনিরহাটের ৫ উপজেলায় আইনের চোখে ফাঁকি দিয়ে দিন দিন বেড়ে চলছে বাল্য বিয়ে। এ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের আনাচে কানাচে হরদম চলছে বাল্য বিয়ে । এ যেন অনেকটা ছেলেখেলা। অবাধে বিয়ের ব্যাপারে কেউ আইন ও প্রশাসনের তোয়াক্কা করছে না।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে স্কুল ও মাদরাসার ছাত্রীরা। তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই বিয়ে দিয়ে শ্বশুর বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে। ফলে সমাজে বাল্যবিয়ের শিকার অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। কেউ কেউ হচ্ছে তালাকের শিকার। আবার কেউবা শিকার হচ্ছে একাধিক বিয়ের। গত এক বছরে এই ইউনিয়নের বিভিন্ন স্কুল, মাদরাসার ৮ম থেকে ১০ম শ্রেণিতে পড়ুয়া শতাধিক ছাত্রী বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। প্রশাসন, বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাল্যবিবাহ সাময়িকভাবে বন্ধ করতে সক্ষম হলেও শেষ পর্যন্ত স্থানান্তরিত হয়ে বিবাহ সম্পন্ন করে।

যে বয়সে ছেলেমেয়েদের বই-খাতা হাতে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা এবং সাথীদের নিয়ে বাড়ির উঠোন কিংবা বাগানে খেলাধুলা করার কথা, ঠিক সেই বয়সেই লেখাপড়া কিংবা খেলাধুলার পরিবর্তে স্বামীর বাড়িতে সংসার বুঝে নেয়ার দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে তাদের। ফলে বছর পেরুতে না পেরুতেই বিচ্ছেদের ঘটনাও ঘটে। সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, যৌতুক প্রথা, দারিদ্র্যতা ও কাজীর অসহযোগিতার কারণে দলগ্রাম ইউনিয়নে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না বলে অভিজ্ঞ মহলের মতামত। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধিও তেমন কোন ভূমিকা পালন করছেন না।

ঈদুল আযহার পর দলগ্রাম ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে বাল্যবিয়ের যা তথ্য পাওয়া গেছে তা হতবাক করার মত। চলতি বছরের জানুয়ারীতে একই মাদরাসায় ২৯ ছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে আর এর মধ্যে তালাকপ্রাপ্ত হয়েছে ১ জন। এক ছাত্রী গিয়েছে ৩য় স্বামীর ঘরে। জানা যায়, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের কাজী আবু হানিফ অনেক ক্ষেত্রে জন্মসনদে বয়স সঠিক না থাকায় মূল ভলিউমে বিয়ে নিবন্ধন না করে কৌশলে নিজে কিংবা অন্য কোন মাধ্যেম দিয়ে আলাদা একটি ফরমে কনে ও বরের তথ্য লিখে রেখে দেন। পরবর্তিতে এ বিয়ের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বিয়ে পড়াননি বলে এড়িয়ে যান।

গত ১১ ফেব্রুয়ারি/১৭ উপজেলার দলগ্রাম বড়দিঘীরপাড় এলাকায় বাবার বিরুদ্ধে জোর করে বাল্যবিয়ে আয়োজনের অভিযোগ করেছিলেন তালুক শাখাতী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর এক ছাত্রী (১৪)। অভিযোগ পেয়ে ওই ছাত্রীর বাবা ছকমল হোসেন (৪৫) এর ১হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মামুন ভূঁইয়া। জরিমানা করার পর ও সেই ছাত্রী টি বিয়ে থেকে রক্ষা পায়নি। গত ২২ মে গভীর রাতে কাজী আবু হানিফ ওই বিয়ে রেজিস্ট্রি করেছেন।

পরিশেষে গতকাল ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে দঃ দলগ্রাম এলাকার মৃত মফিজুল ইসলামের কন্যা ও নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছাত্রী মোছাঃ মারুফা অক্তার (মুন্নি)’ ও বাল্য বিয়ের শিকার হয়েছেন আর এই বিয়ে ও রেজিস্টি করেছেন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়েনের কাজী আবু হানিফ। বাল্য বিয়ে হচ্ছে এমন খবর পেয়ে কালীগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক(এস.আই) রাজু আহম্মেদ সংঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ওই বিয়ে বাড়ীতে অভিযান চালালে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে বর পক্ষ সহ সবাই পালিয়ে যায়। উলে­খ্যঃ গত ৩০ নভেম্বর ২০১৪ ইং তারিখে উপজেলার দলগ্রাম ইউনিয়নের শ্রীখাতা গ্রামের আবুল কালাম আজাদের মেয়ে দলগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী মাহমুদা আক্তার(১৪) কে বিয়ে করতে কনের বাড়িতে বরযাত্রীসহ আসেন বর ফরিদুল ইসলাম।

খবর পেয়ে গভীর রাতে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ নিয়ে কনের বাড়ির বিয়ের আসরে অভিযান চালান ইউএনও গোলাম রাব্বী। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অন্যরা পালিয়ে গেলেও বর ফরিদুল ও নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজী আবু হানিফকে আটক করে পুলিশ। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম রাব্বী বাল্যবিয়ের দায়ে বর ও কাজী আবু হানিফ কে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড দিয়ে শ্রীঘরে পাঠিয়েছিলেন। আইন না মেনে অবাধে বাল্য বিয়ে হওয়াতে একদিকে যেমন স্কুল-মাদ্রাসা থেকে ঝড়ে পড়ছে শিক্ষার্থী, অন্যদিকে বাল্য বিয়ের বহু কুফল পরিলক্ষিত হচ্ছে সর্বত্র।

অপরিণত বয়সে বিয়ের কারণে সু-স্বাস্থ্য, উচ্চ শিক্ষা, পরিপূর্ণ সংসার গঠন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অনেক মেয়েরাই। ফলে সরকারের লক্ষ উদ্দ্যেশ্য ব্যহত হচ্ছে। দিন দিন ভেঙ্গে পড়ছে ওদের স্বাস্থ্য। বিয়ের পর স্বামীসহ শশুরালয়ের লোকজনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পাড়ায় নারী নির্যাতন ও বিয়ে বিচ্ছেদ বাড়ছেই। বাল্য বিয়ে সম্পর্কে পুলিশের ভাষ্য, কোথাও বাল্য বিয়ের খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ ব্যবস্থা নেয়। যে কারনে বিয়ের সাথে জড়িতরা জায়গা পরিবর্তনসহ নানান কৌশলের আশ্রয় নেয়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য