আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট প্রতিনিধি : উজান আর পাহাড়ি ঢলে ধরলার পানি বৃদ্ধি পেয়ে সৃষ্ট বন্যার হাত থেকে লালমনিরহাট সদর উপজেলা রক্ষায় প্রয়োজন মাত্র আধা কিলোমিটার স্থায়ী একটি বাঁধ। কুলাঘাট ইউনিয়নের চরশিবেরকুটি এলাকার ওই একটি স্থায়ী বাঁধই বদলে দিতে পারে কুলাঘাট, লালমনিরহাট পৌরসভা ও বড়বাড়ী ইউনিয়নের দৃশ্যপট।

স্থানীয়দের দাবি, আধা কিলোমিটারের ওই বাঁধ নির্মাণে চিরস্থায়ীভাবে বন্যা ও ভাঙন থেকে রক্ষা পাবে হাজারো মানুষের ভিটেমাটি ও ফসলি ক্ষেত। লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক বন্যায় লালমনিরহাট জেলার ৩৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় ৫৭৫ দশমিক ৮৮৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় নারী ও শিশুসহ মারা গেছেন ছয়জন।

বন্যায় সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া পরিবারের সংখ্যা ১ হাজার ২৭৯টি। আর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৬ হাজার ২৪৪টি পরিবার। এর মধ্যে গৃহহারা ৫ হাজার ৪০২ জন মানুষ উঁচু সড়ক ও বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। সার্বিকভাবে এ বন্যায় ক্ষতির শিকার হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৭৫০টি পরিবার। এছাড়া ৩১ হাজার ১৩৫ হেক্টর রোপা আমন ও ২৬৫ হেক্টর সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ হাজার ৩৯৩টি মসজিদ, ৭৯৭টি মন্দির ও ২২টি গির্জা। ৩০ কিলোমিটার পাকা সড়ক সম্পূর্ণ এবং ১৬৯ কিলোমিটার আংশিক নষ্ট হয়েছে। কাঁচা সড়ক সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৭ কিলোমিটার। ৩২টি সেতু সম্পূর্ণ ও তিনটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কালভার্টের সংখ্যা অর্ধশত। ক্ষতির শিকার হয়েছে অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ৪ হাজার ২৫৬টি পুকুর ও ২৫টি বিলের মাছ ভেসে গেছে।

লালমনিরহাটের কুলাঘাট ইউনিয়নের চরশিবেরকুটি এলাকার বাসিন্দা আদজাদ হোসেন (৫৬) বলেন, ‘এবারের ভয়াবহ বন্যায় ধরলা নদীগর্ভে আমার চাতাল-ভিটেমাটি সবই গেছে। এক একর জমিতে আমন ধান রোপণ করেছিলাম। পাকার মাথা রাস্তাটি ভেঙে পানি প্রবেশ করে পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। আমরা কেউ ত্রাণ চাই না। আমরা চাই চরশিবেরকুটি ওয়াপদা বাঁধ থেকে পাকার মাথা পর্যন্ত আধা কিলোমিটারে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হোক।’

লালমনিরহাট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান বলেন, ‘ধরলায় চরশিবেরকুটি এলাকায় একটি বাঁধ নির্মাণ করা সর্বস্তরের মানুষের দাবিতে পরিণত হয়েছে। সেখানকার লোকজন কষ্টে আছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসনসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং নীতিগতভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে।’

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী কমল কৃষ্ণ রায় বলেন, ‘চরশিবেরকুটি থেকে ওয়াপদা পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়ছে। বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু করা হবে।’ লালমনিরহাট জেলা সড়ক (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজেদুর রহমান বলেন, ‘জেলা শহরের মিশন মোড় থেকে নির্মাণাধীন দ্বিতীয় ধরলা সেতু পর্যন্ত ৮ দশমিক ১ কিলোমিটার সওজের সড়ক আছে। এরই মধ্যে সড়কটির প্রস্থ ১৮ ফুট করার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

খুব শিগগিরই এ সম্প্রসারণ কাজ দৃশ্যমান হবে। তবে কুলাঘাটের পাকার মাথা থেকে চরশিবেরকুটি ওয়াপদা পর্যন্ত বাঁধ না দিলে সড়কটিও ঝুঁকিতে পড়বে। তাই সবকিছুর আগে এ বাঁধ নির্মাণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।’ লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ বলেন, ‘বন্যার পানি নেমে গেছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে।

রাস্তাঘাট মেরামতের কাজও চলছে। আর কুলাঘাটে ধরলার ভাঙন ঠেকাতে ও বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।’

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য