কুড়িগ্রামের উলিপুরে সম্প্রতি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণের জন্য দেয়া লক্ষ-লক্ষ টাকা প্রতারণা করে আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে একটি সিন্ডিকেট চক্রের বিরুদ্ধে। ত্রাণের টাকা আত্মসাৎ করার পর থেকে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের কর্মকর্তাসহ উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য আত্মগোপন করেছেন। ওই চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার গুলো।

এবারে জেলায় ২য় দফা বন্যায় ৬২টি ইউনিয়নের প্রায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে। এর মধ্যে নদ-নদীর ভাঙ্গনে গৃহহীন হয়ে পড়েছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পরিবার। বানভাসী মানুষদের জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান,সংস্থা ছাড়াও অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে অর্থ কিংবা ত্রাণ সহায়তা নিয়ে।
ত্রাণ সহায়তা হিসেবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুক্তাদির চৌধুরী কুড়িগ্রামের ভিটেমাটি হারা ৫১টি পরিবারকে দুই ক্যাটাগরিতে প্রায় ৩০লাখ টাকা বিতরণ করেন বলে বিশ^স্ত সূত্রে জানা গেছে।

গত শনিবার(৯ সেপ্টেম্বর) ঘর-বাড়ি মেরামতসহ এক মাসের খাদ্য সহায়তা হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির প্রচারণা বিমুখ ব্যবস্থাপনা পরিচালক দুঃস্থ পরিবার গুলোকে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা দেন তাদের রংপুর অফিসে। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি সিন্ডিকেট চক্র প্রতারণা করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতারণার স্বীকার হয়েছেন যারা, জেলার উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের কুমার পাড়া গ্রামের সৈয়দ আলীর স্ত্রী কাঞ্চনমালা (৩৮),ধনারবি দাসের স্ত্রী মালতি রবিদাস(৪০), নেছাব উদ্দিনের স্ত্রী আজিরন বেগম(৫২), মহিলা বেগম(৪৫), কদমতলা গ্রামের ভগলু হোসেনের ছেলে আবুল হোসেন(৪৮), মৃত রাজেনের স্ত্রী স্বরবালা (৪৫), আবিরউদ্দিনের স্ত্রী ছবিরন নেছা (৫০), অনন্তুপুর ঘাটে অন্যের বাড়িতে আশ্রিত কফুল্লা আলী (৭০), অন্যের জমিতে আশ্রিত পালপাড়ার মৃত মোহনের স্ত্রী ভিক্ষুক ছবিতারাণী দাস (৫২), তাঁতীপাড়ার মৃত কানুর স্ত্রী বৃন্দেশ^রীসহ ১০জন দরিদ্র পরিবারের সদস্য।

প্রতারণার স্বীকার বৃদ্ধ কফুল্লা আলী জানান, “এবারের বন্যায় চরের মধ্যে হামার বাড়ি-ঘর সউগ ভাসি গেছে। ঘাটের কাছে মানষের ছাপড়া ঘরে কোন রকমের আছং। শনিবার সকালে সাহেব আলী মেম্বর মোক ডাকে নিয়া কয় চল বাহে চাচা রংপুর যামো। অটে গেলে এক কর্মকর্তা তোমাক টাকা দিবে। মাইক্রোত করি নিয়া গেল নাস্তা করেয়া। রংপুরের যায়া একটা অফিস থাকি দুটা লোক আসি মোক গাড়িত থাকি নামাইল। মোক ধরি তিন কি চার তালার উপর তুলি ধরিয়া। পরে একটা লোক আসি টাকার একটা খাম দিয়া কইল চাচা বাহে এই খামে অনেক টাকা আছে কাকো দিবেন না। হামরা ১০ জন টাকা নিয়ে আসার সময় সাহেব আলী সবার কাছ থেকে খাম নিয়ে একটা খাম ছিড়ে তিন হাজার করি টাকা হামাক দেয়”। বাকি খাম গুলা ব্যাগের মধ্যে রেখে দেয় বলে জানান এই বৃদ্ধ।

ধনারবি দাস বলেন, আমার স্ত্রী পাগলী। তার বুদ্ধি-সুদ্ধি কম। বন্যায় চরের ঘর-বাড়ি নষ্ট হওয়ায় বাধের মধ্যে ৩টা টিন দিয়ে বসবাস করছি। সাহেব আলী গত শনিবার (৯ সেপ্টম্বর) সকালে এসে আমাকে বলেন চাচা তোমাক ৩ হাজার টাকা দিবো। এজন্য তোমাক রংপুর যাওয়া লাগবে। আমিও রাজি হয়ে যাই। অভাবের মধ্যে ৩ হাজার টাকা পাওয়াও তো উপকার। পরে তাদের সাথে আমিও যাই। একটা ওষুধ কোম্পানীর অফিসে নিয়ে যায় সবাইকে। সেখানে অনেকের কাছে শুনেছি বন্যায় যাদের ঘর-বাড়ি নষ্ট হয়েছে তাদেরকে ৫০ থেকে ৬০হাজার টাকা দিবে ঘর-বাড়ি আর খাদ্য কেনার জন্য। একজন ভদ্র লোক এসে আমাদেরকে একটা করে টাকার মোটা খাম দেন। টাকা দিয়ে ঐ স্যার বলেন এখানে যা, টাকা আছে তা দিয়ে আপনাদের বাড়ি-ঘর ঠিক করেও খাবার কেনা টাকা আছে। এই খাম গুলো কাউকে দিবেন না। রংপুর থেকে বাড়ি ফেরার সময় রাস্তার মধ্যে সাহেব আলী ১০ জনের খাম গুলো ফেরত নেয়। পরে সেখান থেকে প্রত্যেক কে তিন হাজার করে টাকা দেন।

কাঞ্চনবালা জানান, সাহেব আলী ও একজন কর্মকর্তা একদিন এসে হামার নাম ঠিকানা লিখি নিয়া যায়। পরে শনিবার (৯ সেপ্টম্বর) সকালে হামার এলাকার ১০জনকে মাইক্রোত করি রংপুর নিয়া যায়। সেডে টাকা নিয়া হামরা গাড়িত চড়ি। গাড়ির মধ্যে সবার খাম নিয়া হামাক সবাকে তিন হাজার করি টাকা আর নাস্তার জন্য এক হাজার টাকা দিয়া কয় বাকি টাকা মেলা খরচ হইছে সেটে (সেখানে)দেওয়া লাগবে। কিন্তু সাহেব আলীক কই এ্যাটে বলে ৫০ থেকে ৬০হাজার টাকা আছে। বাকি টাকা কাই নিবে। তখন সাহেব আলী বলে এত প্রশ্ন করলে আর কোনদিন কারো সাহায্য আসলে তোমাক ডাক দিমো না।

আবুল হোসেন জানান, জায়গা-জমি কিছুই নেই আমার। বাঁধের মধ্যেই পরিবার নিয়ে বসবাস করছি। সাহেব আলী এসে বলে রংপুরে এক কর্মকর্তা বাড়ি-ঘর ঠিক করার জন্য টাকা দিবে। সে জন্য শনিবার (৯ সেপ্টম্বর) আমাকে রংপুর যেতে হবে। পরে শনিবার সকালে মাইক্রো বাসে করে ১০জনসহ সাহেব আলী আর কুড়িগ্রাম থেকে একজন স্যারকে তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু রংপুর ঢোকার আগেই সাহেব আলী বলেন, আমার কাজ আছে ফেরার সময়ে দেখা হবে বলে গাড়ি থেকে নামেন। রংপুর চেকপোস্টের ওখানে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় একটা অফিসে। সেখানে আমাদের কাউকে ৫০হাজার এবং কাউকে ৬০হাজার করে টাকার খাম দেয়া হয়েছে বলে অফিসের স্যারের কাছে শুনতে পেরেছি। এই টাকা নিয়ে ফেরার পথে সাহেব আলী আবার গাড়িতে উঠে কিছু দূর গিয়ে ড্রাইভারকে খাবারের জন্য পাঠিয়ে আমাদের খাম গুলো নিয়ে নেয়।পরে সবাইকে ৩ হাজার করে টাকা দেয়্
উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য সাহেব আলী এই ঘটনা প্রকাশের পর থেকে মোবাইল ফোন বন্ধ করে তিনি অত্মগোপন করে রয়েছেন।

ঢাকা মেট্রো গ-১৪১১৮৮ নাম্বারের মাইক্রোবাসের ড্রাইভার আনোয়ারুল জানান,গত শনিবার (৯ সেপ্টম্বর) সকালে সাহেব আলী আমার মাইক্রোটি রংপুর যাওয়া-আসার জন্য ২হাজার টাকায় ভাড়ায় নেন। সন্ধ্যার দিকে ফেরার পথে সাতমাথার ওখানে এসে খাবারের জন্য আমাকে ১২০টাকা দেয়। তবে গাড়িতে টাকা বন্টনের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।

ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের রংপুর ডিস্ট্রিবিউশনের কর্মরত আবুল কালাম আজাদ জানান, আমাদের এমডি কবে এসে টাকা দিয়েছেন তা আমার জানা নেই। আমি তো ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্বে থাকায় এই বিষয়ে কোন কিছু বলতে পারব না। এই বিষয়ে কুড়িগ্রামের এরিয়া ম্যানেজার মাইনুল সাহেব ভাল জানেন।

কুড়িগ্রামের দায়িত্বে থাকা এরিয়া ম্যানেজার মাইনুল ইসলাম ঘটনাটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মোবাইলে জানান, এই বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। অফিস থেকে তালিকা করে তারা টাকা দিয়েছে। আমি পিছনে ছিলাম। কারা তালিকা করেছে এবং কত টাকা দেয়া হয়েছে প্রশ্ন করলে তিনি ফোন কেটে দিয়ে বন্ধ করে রাখেন।

ডেপুটি সেলস ম্যানেজার আমিনুল ইসলাম জানান,আমাদের এমডি স্যার কাউকে সাহায্য সহযোগিতা করেন ঠিকই। তবে তিনি দান করলে ডান থেকে বাম হাতকে জানান না। ফলে কাকে কত করে সাহায্য করেন তিনি এটা বলা মুশকিল। তিনি যেভাবে দান করেন তাতে মোটা অংকের টাকাই থাকে। তবে কুড়িগ্রামে কতজনকে কত টাকা বিতরণ করা হয়েছে এটা মাইনুল ইসলাম ও রংপুরে আজাদ সাহেব বলতে পারবেন। তিনি আরো বলেন, কেউ যদি টাকা আত্মসাৎ করে থাকে তাহলে স্যারকে বলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ ব্যাপারে হাতিয়া ইউপি চেয়ারম্যান বিএম আবুল হোসেন,ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এই ঘটনা শোনার পর আমি সাহেব মেম্বারকে ফোন দিলে সে জানায় ৫০হাজার টাকা না ১০হাজার টাকা ছিল খামের মধ্যে। সবাইকে তিন হাজার টাকা দেয়া হয়েছে বাকি টাকা যাতায়াতের জন্য খরচ হয়ে গেছে। তবে এই টাকা আত্মসাৎ করার পেছনে একটা সিন্ডিকেট দল কাজ করেছে। যাদের জন্য এই ইউনিয়নের একটি বদনাম হয়ে গেল। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেন তিনি। আরো বলেন, প্রচারণা বিমুখ দাতা সংস্থা বা ব্যক্তিগণ দান করার আগে প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে বন্টন করার পরামর্শ দেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য