ভারতে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর যে কর্মসূচি নেয়া হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তা মানবে না বলে জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের ওই পদক্ষেপকে ‘অমানবিক’ বলেও রাজ্য সরকার মন্তব্য করেছে।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কমপক্ষে ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করে বলে সরকার মনে করছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে রাজ্যগুলোকে শরণার্থী ইস্যুতে টাস্ক ফোর্স গড়ে অবৈধভাবে আসা শরণার্থীদের চিহ্নিত করে তাদের ফেরত পাঠানোর জন্য পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গত ৮ আগস্ট এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা বিভিন্ন রাজ্যে পাঠানো হয়েছে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেছেন, ‘রোহিঙ্গারা ভারতের চোখে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। আইনে যেহেতু ওরা বৈধ অভিবাসনকারী নয়, সেজন্য ওদের ভারত থেকে বের করে দেওয়া হবে।’

‘আইন অনুসারেই অবৈধ শরণার্থীদের দেশ থেকে চলে যেতেই হবে’ বলে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু কিরেন রিজিজু সমালোচনা এড়িয়ে পাল্টা জবাবে সাফাইতে বলেছেন, ‘শরণার্থী সমস্যা সমাধান করার জন্য ভারতকে কারো উপদেশ দেয়ার প্রয়োজন নেই। ভারতই বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়েছে ও গ্রহণ করেছে।’

কিন্তু ভারতে বিভিন্ন দেশের শরণার্থী থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকার কেবলমাত্র রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বের দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রশাসনিক এক শীর্ষ কর্মকর্তা অবশ্য কোনো রাখঢাক না করেই বলেছেন, রোহিঙ্গারা ‘মুসলিম’ বলেই কেন্দ্রীয় সরকার এমন অবস্থান নিচ্ছে। কিন্তু কেন্দ্র ‘অমানবিক’ হলেও আমরা তা হতে পারব না।

কেন্দ্রীয় সরকারের চাপে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন হোমে বন্দি থাকা ২৩ জন নারী ও শিশুকে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের দেয়া বিশেষ পরিচয়পত্র বিতরণ বন্ধ রাখতে হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব রাজ্যের মুখ্যসচিবকে কার্যত ধমক দিয়ে পরিচয়পত্র বিতরণ বন্ধ করিয়েছেন।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করে রাজ্য বিজেপি’র সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু একে ‘তোষণ’ বলে মন্তব্য করেছেন। রাজ্য সরকারের উদ্দেশ্যে তার প্রশ্ন এর পরে যদি হাজার হাজার রোহিঙ্গা এ রাজ্যে ঢুকতে শুরু করে, মুখ্যমন্ত্রী সামলাতে পারবেন তো?’

রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় অবশ্য বিজেপি নেতার মন্তব্যকে গুরুত্ব না দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার দেশের মধ্যে সবচেয়ে ‘মানবিক’ এবং একটা মানবিক সরকারের পক্ষে যা করা উচিত, তারা সেটাই করছেন বলে মন্তব্য করেছেন।

এদিকে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করে স্বাগত জানিয়েছেন রাজ্যের বিভিন্ন সংখ্যালঘু সংগঠন।

জামায়াতে ইসলামী হিন্দের পশ্চিমবঙ্গের আমীর মুহাম্মদ নূরুদ্দিন আজ (রোববার) রেডিও তেহরানকে বলেন, ‘রাজ্য সরকারের ওই ‘মানবিক সিদ্ধান্ত’কে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি।’ জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলেরই নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মুহাম্মদ নুরুদ্দিন বলেন, ‘আমরা ভারত সরকারের উদ্দেশ্যেও আবেদন জানাচ্ছি তারা যেন তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এবং মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে যেন চাপ সৃষ্টি করে যাতে সেখানকার চলমান সঙ্কট ও জীবনহানি যাতে বন্ধ হয়।’

এ নিয়ে ‘সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন’-এর সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান রেডিও তেহরানকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওই সিদ্ধান্তে মুসলিম সমাজ খুশি। আমরা আশা করব, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পদক্ষেপকে দেশের অন্য অবিজেপি রাজ্যগুলোও অনুসরণ করবে।’

মুহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপরে যে নারকীয় অত্যাচার চালানো হচ্ছে আমরা আশা করব খুব শিগগিরি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় এর বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার সরকারের অমানবিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আমরা সমস্ত রাজ্য বিধানসভা এবং সংসদেও নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করার দাবি জানাচ্ছি।’ তিনি এ ব্যাপারে দেশের প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের গনহত্যার প্রতিবাদে সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের উদ্যোগে ও বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আগামীকাল সোমবার কোলকাতার মিয়ানমার কনস্যুলেট ঘেরাও, প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে বলেও মুহাম্মদ কামরুজ্জামান জানিয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য