আনোয়ার হোসেন আকাশ, রাণীশংকৈল থেকেঃ ঠাকুরাওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ভরনিয়া ভুতপাড়া গ্রামের শহীদ নিজামউদ্দিনের পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা হয় মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমানের সাথে। তিনি বলেন, ভরনিয়া ভুতপাড়া গ্রামের জাফরউদ্দিন’র ছেলে নিজামউদ্দিনকে বুধবার সকাল ১১ টায় পাক দোসররা ধরে উপজেলার কাশিপুর ঝাড়বাড়ি গ্রামে নিয়ে যায়। সেখানে চেকপোষ্ট গ্রামের লোকমান বিশ্বাস, তোফাজ্জল, সাইদুর, জগদল গ্রামের কালু কমান্ডার যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিচ্ছিলেন আমিও উনার কাছে ট্রেনিং গ্রহণ করি। একই গ্রামের দবিরউদ্দিন, আসিরউদ্দিন, খলিফউদ্দন, কলিমউদ্দিন, ধমরু মোহাম্মদ, সমসের আলী ও ভরনিয়ার নিজামউদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করে।

নিজাউদ্দিনের ছেলে মাইনুল হক জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমি ছোট ছিলাম। এপ্রিল মাসের বুধবার বেলা ১১ টার দিকে পাকিস্থানি বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। কাশিপুর ঝাড়বাড়ি গ্রামে আমার বাবা সহ ৮-১০ জনকে ওই দিনই বিকাল বেলা এক সাথে গুলি করে মারে। আমার খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে দেখি সবাইকে এক জায়গায় মাটি চাপা দিয়ে কবর দেওয়া হয়েছে। বাবাকে গিয়ে আমরা কেউ দেখতে না পেয়ে ফিরে আসি।

মাইনুদ্দিন আরো জানান, তার মা রিজিয়া বেগম দির্ঘ ১৫ বছর প্যারালাইসিস দুরারোগে ভোগার পর চিকিৎসার অভাবে মারা যান। বশত ভিটা ছাড়া বাবার কোন জায়গা জমি নাই। দিন মজুরের কাজ করে যা আয় রোজগার করা হয় তাতেই অনেক কষ্টে দিন কাটাতে হয় পরিবারটিকে। কিন্তু শেষ নয়। মাইনুল হক নিজেই দুরারোগ্য প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে তিন বছর থেকে আয় রোজগার করতে পারছেনা। তার স্কুল পড়–য়া বড় ছেলে দিন মজুরের কাজ করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছে। খেয়ে না খেয়ে অর্ধাহারে অনাহারে শহীদ পরিবারের দিন কাটছে। পরিবারটি সরকারিভাবে কোন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেনা। তাদের মানবেতর দিন কাটছে।

পাক বাহিনী যে বর্বরতা চালিয়েছে বাঙ্গালীর উপর, চালিয়েছে হত্যা যঙ্গ। অমানবিক আচরনের বিরুদ্ধে এলাকার মানুষ নর পশুদের সোচ্চার আন্দোলন গড়ে তোলে। এটা সহ্য করতে না পেরে শান্তিপ্রীয় নিরিহ বাঙ্গালীকে হত্যার পথ বেছে নেয় নর পিশাচের দল। ভরনিয়া গ্রামের নিজামউদ্দিন, লোকমান হোসেন, কালু কমান্ডার সহ এলাকার লোকজনকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে এমন কথাগওলো বললেন মুক্তিযোদ্ধা সোলাইমান ও জবদুল হক।

নিজামউদ্দিন, লোকমান হোসেন, কালু কমান্ডার, খলিফউদ্দিন, দবিরউদ্দিন সহ একই সাথে ৮ জনকে পাক বাহিনী নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করার সময় প্রতক্ষ্যদর্শি কাশিপুর ঝাড়বাড়ি গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে একরামুল হক বলেন, পাকিস্থানি বাহিনী পিক আপ ভ্যানে করে ধরে এনে একই সাথে ৮ জনকে গুলি করে। কয়েক জনের দম না গেলে তারা পানির জন্য ছটপট করে। পানি খেতে চাইলে বন্ধুকের আগায় থাকা চাকু দিয়ে একজনের পেট কেটে দেওয়া হয়। আমরাকে পানি আনতে বলে। খেতে দিলে খাওয়ার পর পেটের ভিতর থেকে পানি বাইরে পড়ে যায়। হায়েনাদের বর্বরতা সহ্য করতে না পেরে তারা বলতে থাকে আমাদের গুলি করে মেরে ফেল। আবার গুলি করে তাদের মেরে ফেলা হয়। আমাদের কোদাল আনতে বলা হয়। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে আমাদের। গর্ত করে মাটি চাপা দিতে বলে সবাইকে এক সাথে। আমরা নিজ হাতে এখানে ৮ জনের কবর দিই।

তখনকার কথাগুলো কিভাবে বলব বাবু, আট জন লোককে ধরে এনে এক সাথে গুলি করে মারে। কয়েকজন মারা যায়নি। তখন ব্যালট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে মারে। পানি খেতে চাই। খেতে দিলে পেটের ভিতর থেকে পানি বাইরে পড়ে যায়। মানুষকি কি এত অত্যাচার সহ্য করতে পারে মেরে ফেল মেরে ফেল বলে চিৎকার করতে থাকে। তাদের গুলি করে মেরে ফেলার পর এক সাথে সবগুলোর মাটি দেওয়া হয় এমন লোক হর্ষক বর্ননা দিচ্ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী ৮০ বছর বয়সি সখিনা খাতুন।

পরিবারের আকুতি বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক সম্মান, এক মুঠো ডাল ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার মর্যাদা দিয়েছেন। বিরঙ্গণা মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী-ভাতা দিয়ে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মর্যাদার আসন দিয়েছেন। তেমনি দেশ স্বাধীকার আন্দোলনের সময় শহীদ হয়েছেন তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদী মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার আকুতি জানিয়েছেন শহীদ পরিবারের লোকজন।

এ ব্যাপারে পঞ্চগড়-ঠাকুরগাও সংরক্ষিত ০১ আসনের সাংসদ মোছাঃ সেলিনা জাহান লিটা শহীদ পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বিষয়ে মহান সংসদকে অবহিত করা হবে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য