আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট থেকে: লালমনিরহাটে বন্যা পরবর্তী ত্রাণ বিতরণের সময় নির্বাচনী প্রচারণায় তৎপর হয়ে উঠেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা। ত্রাণ বিতরণের সময় কখনও বুকে জড়িয়ে ধরে, কখনও মাথায় হাত বুলিয়ে নানা কৌশলে বন্যার্তদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন তারা।

সরাসরি ভোট না চাইলেও তাদের আচরণেই মিলে ভোট চাওয়ার আকুতি। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতারা বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণের মাধ্যমে নিজের অবস্থান প্রকাশ করছেন। ত্রাণ বিতরণের সময় তারা নিজেদের কথা বলছেন, তাদের মনে রাখার কথা বলছেন। অন্য দলের সমালোচনা করছেন।

জানান দিচ্ছেন, সামনে নির্বাচন, ত্রাণের বিষয়টা যেন মনে থাকে! কোনো কোনো নেতা ছবি তুলছেন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হতে, কারণ ত্রাণ বিতরণের এসব ছবি পরবর্তীতে তারা কেন্দ্রীয় নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন বলেও জানা গেছে। বন্যার পরের দিনে নির্বাচনী এলাকায় ছুটে আসেন লালমনিরহাট-১ আসনের এমপি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবং লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতাহার হোসেন। বন্যায় সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হাতীবান্ধা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সরকারি কর্মকর্তা ও দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে ছুটে চলেন।

সরকারি সকল কর্মসূচি বাতিল করে টানা ৭ দিন হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি এলাকা ঘুরে দেখেন।বন্যার্ত মানুষদের পুনর্বাসনের আশ্বাসও দেন তিনি।মোতাহার হোসেন এমপি বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বন্যা পরিস্থিতি সফলতার সাথে মোকাবেলা করছি। প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। কিন্তু বিএনপির নেতারা ত্রাণ বিতরণের নামে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার চেষ্টা করছে।’ ইতোমধ্যে সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর তার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ১ দিনের বেতন থেকে ১০ লক্ষ টাকা লালমনিরহাটের বন্যার্ত মানুষদের মাঝে বিতরণ করেছেন। আর জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক এ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান প্রতিনিয়ত বন্যার্ত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করে নিজের প্রার্থী হওয়ার আগাম বার্তা দিচ্ছেন।

বন্যার দিন থেকেই লালমনিরহাট সদর উপজেলায় ত্রাণ বিতরণে তৎপর হয়ে উঠেন ওই আসনের বিএনপির প্রার্থী সাবেক উপমন্ত্রী ও লালমনিরহাট জেলা বিএনপি’র সভাপতি অধ্যক্ষ আসাদুল হাব্বি দুলু। কখনও গাড়িতে করে আর কখনও পায়ে হেঁটে কোমর পানি পার হয়ে দলীয় নেতা কর্মীদের নিয়ে ত্রাণ বিতরণে ছুটে চলেছেন তিস্তা ও ধরলার চরাঞ্চলে।

আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘লালমনিরহাট জেলায় এবারে বন্যায় ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু সরকারিভাবে তাদের মাঝে তেমন ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে না। আমরা দলীয়ভাবে ত্রাণ নিয়ে বন্যার্তদের পাশে দাড়াঁনোর চেষ্টা করেছি।’এছাড়া বিএনপি’র কেন্দ্রীয় ত্রাণ কমিটি লালমনিরহাটে এসে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। সাংবাদিক সম্মেলন করে লালমনিরহাট জেলাকে বন্যা দুর্গত এলাকা ঘোষণারও দাবি করেছেন দলটির কেন্দ্রীয় ত্রাণ কমিটি।

আর নেতা-কর্মীদের নিয়ে ত্রাণ বিতরণ করে গণ সংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন লালমনিরহাট-১ আসনের বিএনপি’র এমপি প্রার্থী ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীন আকন্দ।

বসে নেই জাতীয় পাটির নেতা-কর্মীরা। লালমনিরহাট-২ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী কেন্দ্রীয় নেতা রোকন উদ্দিন বাবুল বন্যার সময় ভারতে থাকলেও সফর সংক্ষিপ্ত করে চলে আসেন তার নির্বাচনী এলাকায়। ত্রাণ নিয়ে ছুটে চলেন আদিতমারী ও কালীগঞ্জের বন্যার্ত এলাকাগুলোতেও। তবে অতি গোপনে ত্রাণ বিতরণ করে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম এলাকায় তাদের অবস্থান চোখে পরার মতো। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির পাশাপাশি বাম সংগঠনগুলোও এবারের বন্যায় ত্রাণ বিতরণ করছেন।

হাতীবান্ধা উপজেলার সির্ন্দুনা এলাকার বন্যা কবলিত মনজুর হোসেন ও সামসুল আলম জানান, এবারের বন্যায় সরকারের পাশাপাশি অনেক রাজনৈতিক দল ত্রাণ বিতরণ করছেন। সবার সহযোগিতায় আমরা বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা করছি।
প্রসঙ্গত, চলতি বছর তিস্তা, সানিয়াজান ও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে লালমনিরহাটের ৫ উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। ওই বন্যায় সরকারি হিসেবে ১ লক্ষ ২ হাজার ৭ শত ৫০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে ৮ হাজার ৭ শত ৯২ হেক্টর আমন ক্ষেত। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরে বন্যার্ত এলাকাগুলোতে দেখা দেয় চরম দুর্ভোগ। রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলোও ত্রাণ বিতরণে তৎপর হয়ে ওঠে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য