আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট প্রতিনিধি: লালমনিরহাটে বিভিন্ন বাঁধ ও রাস্তার ওপর খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নেয়া শত শত বানভাসি নারী ও শিশু খুব কষ্টে দিনযাপন করছে। বেশির ভাগ এলাকাতেই ত্রাণ পৌঁছেনি, বিশুদ্ধ পানি ও শিশুখাদ্যের সংকট, শৌচাগার না থাকায় দুর্ভোগে নারীরা। অনেকেই নিঃস্ব হয়ে গেছেন। বন্যার পানি নেমে গেলে কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবেন, সেই অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন তারা।

এদিকে গতকাল ধরলা নদীর পানিতে সৃষ্ট বন্যায় আটকে পড়া দুই পরিবারের কিছু সদস্য নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় তিন শিশু ও এক নারীসহ পাঁচজন ডুবে মারা গেছে। নিহতরা হলো— শিশু নাজিম হোসেন (৪), আলিফ হোসেন (৭), আব্দুল মোতালেব (১৭), নাজিম হোসেনের মা নাজমা বেগম (২২) ও মোজাম্মেল হক (৪৫)। তারা সবাই সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের পূর্ব পরুয়া এলাকার বাসিন্দা।লালমনিরহাট জেলা (ভারপ্রাপ্ত) ত্রাণ কর্মকর্তা সুজাদ্দৌলা জানিয়েছেন, ১ লাখ ২ হাজার ৭৫০টি বন্যাদুর্গত পরিবারের জন্য এরই মধ্যে ৩৮২ টন চাল ও ১২ লাখ ৯৫ হাজার নগদ টাকা এবং ১ হাজার ৭০০ প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

৯৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৮ হাজার ৯৫৬টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। বন্যার পানি নামতে শুরু করায় নিজ ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন অনেকে। গতকাল লালমনিরহাটের সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের পাকার মাথাসহ অন্যান্য উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন এলাকার বাঁধ ও রাস্তার ওপর অবস্থান করছে নিঃস্ব পরিবারগুলো। চরম দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন তারা। পাকার মাথা বাঁধের ওপর ৫০টির বেশি গৃহহীন পরিবার বসবাস করছে। এ বাঁধসহ জেলার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় বাঁধ ও রাস্তার ওপর অবস্থানকারী গৃহহীন বন্যাদুর্গতদের মাঝে সরকারি কোনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি। বাঁধে অবস্থানকারী বানভাসিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গতকাল পর্যন্ত তারা এক ছটাক চাল বা কোনো ত্রাণসামগ্রী পাননি।

গত মঙ্গলবার একটি এনজিও থেকে এক প্যাকেট করে খিচুড়ি পাওয়ার কথা জানান তারা। তবে সরকারি ত্রাণ এখনো তাদের কাছে পৌঁছেনি।ঘটনাস্থল থেকে সেলফোনে লালমনিরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ত্রাণস্বল্পতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ১৫ টন চাল কুলাঘাট ইউনিয়নে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু বানভাসি লোকজনের সংখ্যা অনেক বেশি। এজন্য সবাইকে একযোগে ত্রাণ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ত্রাণ বিতরণ চলমান রয়েছে, তারাও পাবেন।

এনজিওর খিচুড়ি বিতরণের সময় নিজে থেকে তদারক করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।জেলার বন্যাকবলিত ৩৫টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার বানভাসি মানুষের অবস্থা প্রায় একই। এছাড়া ৯৭টি বিদ্যালয়ে বন্যাকবলিতরা আশ্রয় নিলেও সেখানে শৌচাগার, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও শিশুখাদ্যের সংকট রয়েছে। বয়স্করা ত্রাণ পেলেও শিশুদের উপযুক্ত কোনো খাবার নেই। এসব শিশু শুধু মায়ের বুকের দুধের ওপর টিকে আছে। বাধ্য হয়ে অনেক শিশুকে বড়দের খাবারই খাওয়ানো হচ্ছে।

এতে তাদের পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। উন্মুক্ত স্থানে মলত্যাগের ফলে বন্যার পানি ভয়াবহ রকম দূষিত হয়ে পড়ছে। পরবর্তীতে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে।শিশুখাদ্যের বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন শফিউল আরিফ বলেন, বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শিশুদের প্রতি বিশেষ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিশুদের জন্য সরাসরি কোনো ত্রাণসামগ্রীর ব্যবস্থা নেই। আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। তবে এ বিষয়ে আমি বিশেষ ব্যবস্থা নেব।

স্বাস্থ্যসেবার অবস্থাও করুণ। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের মেডিকেল টিমগুলোর অস্তিত্ব শুধু কাগজে-কলমে। তাদের কার্যক্রম কোথাও চোখে পড়ছে না। বিজিবি ও সেনাবাহিনীর নিজস্ব মেডিকেল টিম কিছু এলাকায় চিকিত্সাসেবা দিচ্ছে। লালমনিরহাট সিভিল সার্জন ডা. আমিরুজ্জমান বন্যাদুর্গতদের চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করতে ৫৪টি মেডিকেল টিম গঠন করার তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, একাধিক মেডিকেল টিমের লিডার হিসেবে একজন করে চিকিত্সক রয়েছেন। এসব চিকিত্সক মেডিকেল টিম ও হাসপাতাল দুটোই দেখছেন। আমরা শুধু পাতলা পায়খানা ও খোসপাঁচড়া (চুলকানি) জাতীয় রোগী ছাড়া তেমন কোনো রোগী পাইনি।

তবে এসব মেডিকেল টিমকে কোথাও খাবার স্যালাইন বা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করতে দেখা যায়নি।এ ব্যাপারে লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়-বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোতাহার হোসেন বলেন, তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজানসহ সব নদ-নদী ভরাট হয়ে গেছে। অল্পতেই বন্যা সৃষ্টি হয়ে কৃষকের ফসল নষ্ট করে ফেলছে। এবারের বন্যায় ২০০ কোটি টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব লোকের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়া কঠিন। আপাতত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী দিয়ে তাদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে সরকার। শিশুদের সুরক্ষায় এরই মধ্যে জেলা প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য