মাসুদ রানা পলক, ঠাকুরগাঁও থেকেঃ ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় আশ্রয় কেন্দ্র নির্মানের দাবি, উত্তর জনপদের হিমালয় পাদদেশে ঠাকুরগাঁও জেলার অবস্থান। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক উচু জেলা এটি। উঁচু এলাকা হওয়ায় ঠাকুরগাঁওসহ পাশ্ববর্তী জেলা গুলোতে সহসা বন্যা হয় না। যে কারণে ঠাকুরগাঁও জেলায় আগে থেকে বন্যা নিয়ে মানুষের তেমন কোন প্রস্তুতি থাকে না।

সর্বশেষ ১৯৮৮ সালের বন্যায় তলিয়ে গিয়েছিল পুরো ঠাকুরগাঁও জেলা। পানিবন্দি হয়ে অসহায় হয়ে পড়েছিল প্রায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ। বন্যার কারণে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশুসহ প্রায় ২০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে জানা গেছে। ওই সময় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলের।

এরপর থেকে ঠাকুরগাঁওয়ে বন্যার তেমন কোন প্রভাব ল্য করা যায়নি। এই জেলা বন্যা কবলিত এলাকা না হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনও কোন প্রকার সরকারি আশ্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহন করেনি। বছরের বেশির ভাগ সময় পানির অভাবে জেলার টাঙ্গন নদী সহ ১১ টি নদী মরা খালে পরিণত হয়ে থাকে। এই জেলায় সপ্তাহ খানেক আগেই খরার কারণে পানির অভাবে কৃষকরা গভীর নলকূপ ও শ্যালো মেশিন দিয়ে ফসল উৎপাদন শুরু করেন।

গত ১২ আগষ্ট হঠাৎ প্রবল বর্ষণে উজান থেকে ধেয়ে আসা পানিতে শহরের টাঙ্গন নদীর তীরবর্তী জনবসতিগুলোসহ জেলার অন্যান্য ১০ টি নদীতে রেকর্ড পরিমাণ পানি প্রবেশ করে। জেলার ৫টি উপজেলার ৪০ টি ইউনিয়নের প্রায় অর্ধেক নিম্নাঞ্চল এলাকা বন্যায় তলিয়ে যায়। আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে লাখো মানুষ।

চলতি বন্যায় এ পর্যন্ত পানিতে ডুবে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরো দুই জন।

ত্রাণ আর বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছে বানভাসি মানুষ। আশ্রয়ের জন্যও ছুটাছোটি করছে অসহায় মানুষ। জেলায় বানভাসী মানুষের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ৬৫ টি অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় ১৪ হাজার মানুষের থাকার ব্যবস্থা করেন। আর অনেকেই সে সকল অস্থায়ী আশ্রকেন্দ্রে জায়গা না পেয়ে রাস্তার পাশে গাছ তলায় পলিথিনের ছাউনী তৈরি করে আশ্রয় নিয়েছে।

জেলার পানিবন্দি বহু মানুষ ঘরের মালামাল ও গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছে। ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের বিভিন্ন উঁচু জায়গা গুলোতে আশ্রয় নেয় তারা। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিনভর তাদের বাড়ির ওই সব মালামাল নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন দূর্গত মানুষেরা।

বন্যাকবলিত উপজেলা গুলোতে বেশির ভাগ এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছে নাই। খাবারের পাশাপাশি নিজেদের থাকার জায়গা এবং গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়ে বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষ।

বন্যায় ভোগান্তির শিকার আশ্রয়কেন্দ্রের মানুষেরা জানিয়েছেন, অনেকে সময় মত পর্যাপ্ত খাবার পায় নাই। ছোট শিশুদের নিয়ে বিপাকে পড়েন অনেক মা। সম্বল হারানো মানুষ বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও খাবার সংকটে ভুগে। জেলায় সাধারণ মানুষেরা বন্যাসহ প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবিলার জন্য জেলার প্রতিটি উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মান ও পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রাখার দাবি করেছেন স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের প্রতি।

ঠাকুরগাঁও প্রেসকাবের সভাপতি আবু তোরাব মানিক বলেন, সরকার আগেই প্রতিটি জেলায় বন্যা মোকাবিলা করার জন্য আশ্রয় কেন্দ্র নির্মান করলে কোন প্রকার প্রাণহানীর ঘটনা ও ক্ষতির পরিমান অনেকাংশে কম হত। আমরা ঠাকুরগাঁওবাসি এ জেলায় একটি আশ্রয়কেন্দ্রের দাবি জানাচ্ছি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক মাউদুদুল হক জানান, বন্যার পানিতে নতুন করে রোপা আমনসহ ৩৭ হাজার ৫শ হেক্টর জমির ফসল পানি নিচে। এতে কৃষকের তি হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পূর্নবাসন অফিসের তথ্য মতে, জেলার ৫ টি উপজেলার ৪০টি ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ৪২ মে. টন চাল ও নগদ দেড় লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

জেলা এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী কান্তেশ্বর বর্মন জানান, এবারের বন্যায় ৬৬ কি. মি. পাকা ও ২২০ কি.মি. কাঁচা রাস্তা, ২২ টি বড় ব্রিজ ও কমপ্লেক্স, ৮৬ টি কার্লভার্টসহ সংযোগ সড়ক ভেঙে প্রায় ৪০ কোটি টাকার য়তি হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল জানান, জেলা আশ্রয় কেন্দ্রের প্রয়োজন আছে। এই জেলায় তেমন জোবদ্ধতা ও বন্যার কোন পরিস্থিতি তেমন একটা হয় না। ১৯৮৮ সালের পর যে বর্তমানে জলবদ্ধতা বা বন্যা হয়ে সেটি অনেক দিন পরে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো করলে সেগুলো দেখভাল করতে হয়। তবে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা জন্য তৈরি করা বড় হলগুলো প্রাকৃতিক দূর্যোগে সময় আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য