আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট প্রতিনিধি: ঝুলন্ত সেতুর মতো মনে হলেও আসলে তা নয়! বন্যায় রেললাইনের নিচের মাটি সরে গিয়ে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। বুধবার লালমনিরহাট-বুড়িমারী রেলপথের হাতীবান্ধা স্টেশনের কাছে এ দৃশ্য দেখা যায়।লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলা থেকেই ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে বন্যার পানি। সেই সাথে ভেসে উঠছে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির ভয়াল চিত্র। বাড়িঘর থেকে পানি সরে গেলেও রাস্তাঘাটের বেহাল দশায় বেড়েই চলেছে মানুষের ভোগান্তি। তবুও আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা পরিবারগুলো নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে।

তবে তিস্তা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও মানুষের ভোগান্তির যেন শেষ নেই! আবারও বন্যার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন তিস্তা পাড়ের বাসিন্দারা।’হামার কষ্টের কথা শুনি কি হইবে ভাই। আল্লায় হামার কপালোত কি এত দুঃখ কষ্ট লেখি থোছলো!’—হাতীবান্ধা উপজেলার সিংঙ্গীমারী ইউনিয়নের উত্তর ধুবনীর এলাকার সিরাজুল ইসলাম (৪০) এভাবেই বুধবার তার কষ্টগাথা বর্ণনা করেন।সিরাজুল ইসলাম, সিদ্দিক আলী এবং ইদ্রিস আলী তিন ভাই। সাম্প্রতিক বন্যায় তাদের ১০টি টিনের ঘর নদীগর্ভে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। গত তিন দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে বাস করছেন তারা। দুপুরে সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘মানুষের অভাবে ভেসে যাওয়া ঘরের টিন, আসবাবপত্র উদ্ধার করতে পারিনি। স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে অন্যের বাড়িতে রয়েছি। তিন দিনেও কারো কাছ থেকে কোন সাহায্য-সহায়তা পাইনি।’

সরেজমিনে হাতীবান্ধা ও আদিতমারী উপজেলার কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, বানভাসি মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখগাথা। হাতীবান্ধার মধ্য গড্ডিমারীতে ‘তালেব মোড়’ নামের একটি বাজার। বন্যায় সেই তালেবের পাকা দোকানটিও ভেঙে তছনছ হয়ে পড়ে আছে। বাজারের আরও কয়েকটি দোকান ভেসে গেছে বানের পানিতে। সেখান থেকে সামান্য কিছুটা এগিয়ে গেলেই চোখে পড়ে বিশাল একটি ভাঙা অংশের মাথায় দাঁড়িয়ে শাহীনুর নামের এক যুবক।বুকভরা কষ্ট নিয়ে শাহীনুর বলেন, ‘এখানে আমাদের বাড়ি থাকলেও আজ সব অতীত। রবিবার রাতে কিছু বুঝে ওঠার আগেই গোটা সড়কটি ভেঙে নিমিষেই বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ে। জীবন বাঁচাতে পাশের একটি সড়কে আশ্রয় নিই। পরদিন সকালে দেখি বাড়িটি পানিতে ভেসে গেছে।’ সরকারি সহায়তা বলতে ত্রাণের চাল ছাড়া আর কিছুই জোটেনি শাহীনুরের কপালে। তার মতো আরও অনেকেরই ঠাঁই হয়েছে সড়কের ওপরে বা অন্য কোন উঁচু জায়গায়।এদিকে, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা ইউনিয়নের দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয় বন্যাকবলিত ৩ শতাধিক মানুষ। তাদের মধ্যে অনেকেই নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে। বন্যায় ২৫০টি পরিবারের বাড়িঘর পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ২ হাজার ৬৫০টি। এই ইউনিয়নের লোকজন আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়াও সলেডি স্পার বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে।

এরইমধ্যে আদিতমারীর বন্যাকবলিত এলাকায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করেছেন। স্থানীয় ডাকবাংলায় অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে মেডিকেল টিমসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তারা।লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক সফিউল আরিফ বলেন, ‘ত্রাণ তৎপরতার পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা দিতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছেন।’ জেলায় বন্যাকবলিতদের মাঝে ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।

আদিতমারী উপজেলা প্রকল্প অফিস জানিয়েছে, চলতি বন্যায় উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫টি ইউনিয়নের ৩৬টি গ্রামের ১০ হাজার পরিবারের ৪০ হাজার ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া বন্যার কারণে উপজেলার ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলি জমির পরিমাণ ২ হাজার ৭৯৭ হেক্টর।

আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আসাদুজ্জামান জানান, ‘বন্যাকবলিত লোকজনের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনী কাজ শুরু করছে।’এদিকে, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলাকায় সরকারিভাবে জিআর ৬৮ মেট্রিকটন চাল, এক হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার ও ৪ লক্ষ টাকা জিআর ক্যাশ নগদ বিতরণ করা হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, সরকারিভাবে বন্যাকবলিত মানুষজনের জন্য বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই বিতরণ করা হবে।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলো বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গায় বানভাসি মানুষদের শুকনো খাবারসহ বিভিন্ন ত্রাণ সহায়তা করে যাচ্ছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য