কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার ৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির প্রায় ১২ হাজার ২৫১ জন শিক্ষার্থীদের খেলার ছলে সাবলীলভাবে পড়তে শেখার কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে ২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তাদের স্লিপ ফান্ডের মাধ্যমে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বর্ণের গাছ স্থাপন করা হয়েছে।

বর্ণের গাছ স্থাপনের ফলে বিদ্যালয়গুলোতে নতুনভাবে পড়া বান্ধব একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়। প্রারম্ভিক শ্রেণির শিক্ষকবৃন্দ তাদের শিক্ষার্থীদের বর্ণজ্ঞান বৃদ্ধি করতে ক্লাসের বাহিরে স্থাপিত বর্ণগাছের সহায়তায় বর্ণজ্ঞান চর্চা করছে। খেলার ছলে শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে, শুদ্ধ উচ্চারণে বর্ণ চর্চা করছে। ফলাফল হিসেবে দেখা যায় এসব বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিশু এলোমেলো বর্ণ চিনতে ও বলতে পারছে। এটি একটি অভিনব কৌশল হিসেবে বিদ্যালয়গুলো গ্রহণ করে কার্যকর ফল পাচ্ছে। এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে পার্শ্ববর্তী উলিপুর উপজেলায় ৭টি বিদ্যালয়ও তাদের বিদ্যালয়ে বর্ণগাছ স্থাপন করে শিশু ও প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বর্ণমালা চর্চার কাজ শুরু করেছে।

তাই বর্ণগাছের সফলতা কুড়িগ্রামে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। এর সত্যতা ও যৌক্তিকতা জানতে সেনেরখামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় প্রথম শ্রেণির সহকারী শিক্ষক রাজিয়া সুলতানা তার শিক্ষার্থীদের ক্লাসের বাহিরে বর্ণগাছের কাছে নিয়ে গিয়ে শেখানো বর্ণ তারা চিনতে পারছে কিনা তা মূল্যায়ন করছেন। নির্দেশিকা কাঠি যে কোন একটি বর্ণের উপর রেখে শিক্ষক বর্ণের নামটি শিক্ষার্থীদের নিকট জানতে চাচ্ছেন, আর শিক্ষার্থীরা সবাই হাত উঁচু করে তাদের উত্তরটি জানা আছে সেটি প্রকাশ করছেন। শিক্ষক হাত উঁচু করে তুলে ধরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে একজনকে বর্ণটি কী জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দিচ্ছে। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর এবার শিক্ষক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বললেন কে কে নীচ থেকে উপর পর্যন্ত গাছের প্রতিটি পাতায় লিখিত বাংলা বর্ণগুলো পড়তে পারবে? সকল শিক্ষার্থী একসাথে হাত তুলে তাদের সামর্থ্য জানান দিলো।

শিক্ষক তাদের মধ্যে থেকে একজন শিক্ষার্থীকে বলতে বললো, সে ততক্ষণাৎ নির্দেশিকা কাঠি দিয়ে একে একে সবগুলো বর্ণ পড়ে শোনালো, সাথে সাথে অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও সমস্বরে বর্ণগুলো বলতে লাগলো। বর্ণমালা চর্চার এই অভিনব কৌশল এবং শিক্ষার্থীদের সামর্থ্যরে প্রকাশভঙ্গী দেখে সবার ধারণা প্রাথমিক শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধিতে সহায়ক ভুমিকা রাখবে।

সেনেরখামার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুফিয়া বেগম বলেন “আমরা যদিও আমাদের স্লিপ ফান্ড থেকে বর্ণেরগাছটি তৈরি করেছি, তবে বে-সরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস এর রিড প্রকল্পের কর্মীবৃন্দের উদ্বুদ্ধকরণ, ডিজাইন এবং এটির যথাযথ ব্যাবহারের দিক নির্দেশনার কারণে এর সুফল পাওয়াগেছে। এছাড়া এটি আমার বিদ্যালয়ের বাহিরের পরিবেশকে দিয়েছে একটি নতুন মাত্রা, যার মাধ্যমে বিদ্যালয়ে একটি পড়া বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে”।

সুভারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খন্দকার তানজিনা মমতাজ বলেন, শিশুরা খেলা-ধূলার পাশাপাশি পড়তে পারছে। বর্ণ চিনতে পারছে এবং সেটা মনে রাখতে পারছে। এটা বিশাল সফলতা।

উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার নার্গিস ফাতেমা তোকদার জানান “রিড প্রকল্পের কর্মীবৃন্দ বিদ্যালয়গুলোতে বর্ণগাছ স্থাপনের একটি উদ্যোগ গ্রহণ করতে আলোচনা করে। কাজটি ভাল হওয়ায় আমার ক্লাস্টারের বিদ্যালয়গুলোতে বর্ণগাছ স্থাপনের জন্য প্রধান শিক্ষকদেও পরামর্শ দেই। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় প্রায় ২০টি বিদ্যালয়ে এই বর্ণগাছ স্থাপন করা হয়েছে এবং এটি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের বর্ণমালা চর্চা করা হচ্ছে, যার ফলে শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে বর্ণমালা চর্চা করছে এবং তাদের শিখনও স্থায়ী হচ্ছে। আমরা খুবই আশাবাদী আগামী বছরের মাঝামাঝি পর্যায়ে আমরা কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সকল বিদ্যালয়ই একটি করে বর্ণগাছ স্থাপনে সক্ষম হব”।

আরডিআরএস এর রিড প্রকল্পের টেকনিক্যাল অফিসার নুরুজ্জামান বলেন, ইউএসএআইডি এর আর্থিক সহায়তায়, সেভ দ্য চিল্ড্রেন এর কারিগরী সহযোগিতায়, আরডিআরএস বাংলাদেশ কর্তৃক বাস্তবায়িত রিড প্রকল্প শিশু শিক্ষার্থীদের সামর্থ্যবৃদ্ধির লক্ষে কাজ করছে। বর্ণের গাছের মাধ্যমে গুণগত শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এ গাছ নির্মাণ ও স্থাপন করতে সর্বমোট ৫ হাজার টাকা খরচ হয়। যে কোন বিদ্যালয় ইচ্ছা করলে তাদের বাৎসরিক স্লিপ ফান্ড থেকে এটি ব্যয় করে স্থাপন করতে পারে। বিদ্যালয়ে ফিরবে পড়া বান্ধব এক নতুন পরিবেশ। বিশেষ করে বাংলা ও ইংরেজি বর্ণ এবং সংখ্যা শিখনের ক্ষেত্রে ভুমিকা রাখবে। যার ফলাফল হিসেবে শিক্ষার্থীদের শিখন হবে স্থায়ী।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য