মাসুদ রানা পলক, ঠাকুরগাঁও থেকেঃ ঠাকুরগাঁওয়ে গত তিন দিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দুই জনের আত্ম হত্যা নিয়ে জনমতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আর এই আত্মহত্যার কারণ হিসেবে অনেকেই অসচেতন অভিভাবক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুককে দায়ী করছেন।

প্রত্যাশা আক্তারের অকাল মৃত্যুর পর আবারো ঠাকুরগাঁও শহরের গোয়ালপাড়া এলাকায় তন্ময় তানজিম (২৩) নামে এক যুবক ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। আজ মঙ্গলবার বেলা ১২ টায় তন্ময় তানজিমের নিজ শোবার রুম থেকে গলায় ফাঁস দেওয়া ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয় বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।

শহরের গোয়ালপাড়া এলাকায় ওহিদুল ইসলামের ছেলে তন্ময় তানজিম (২৩)।

তন্ময় তানজিম গলায় ফাঁস দেওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সোমবার ৩১ জুলাই দুপুর ১২.৫৮ মিনিটে প্রথম স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন,“আমি তোমাকে অনেক মিস করছি, তুমি জানতা আমি একটু পাগল টাইপের, তুমি তো মানিয়ে নিতে পারতা। তুমার নাম্বারটাও আমি রেগে ডিলিট করে দেই, কিন্তু আমি সত্যি তোমাকে অনেক মিস করছি”।

ওই দিনেই বিকেল ৪.২৫ মিনিটে তানজিম তার ফেসবুকে এক সংবাদকর্মীর টাইম লাইন থেকে প্রত্যাশার মৃত্যু নিয়ে একটি প্রতিবেদনের কিছু কথা কপি করে শেষ স্ট্যাটাসটি দিয়েছিল, “২২ জুলাই দিনটি ছিল শনিবার। সন্ধ্যা ৭টা ২২ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে “প্রত্যাশা আক্তার” তার নিজ টাইম লাইনে লিখেছিলেন, “সব বলা হয় তো শেষ হয় না।।। অবশেষে শেষ নি:শ্বাস” (কেউ কমেন্ট করবেন না প্লিস)। এর পরেই প্রায় সে ৪০টি ঘুমের ওষুধ খায় বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। এদিকে গত ২৯ জুলাই রবিবার এ ঘটনার পর মৃত প্রত্যাশাকে নিয়ে ফেসবুক মহলে তার বন্ধু বান্ধব ও শুভাকাঙ্খিরা প্রত্যাশিত ও অপ্রত্যাশিত বিভিন্ন মন্তব্য করছেন। যা ভাইরালে পরিণত হয়েছে।

অনেকে প্রত্যাশার মৃত্যুর আগের স্ট্যাটাসটিতে মন্তব্য করেছেন। অনেকে আবার শেষ নি:শ্বাস ত্যাগের পর তার আত্মার শান্তি কামনা করে নানান কথা লিখেছেন। অনেকেই প্রত্যাশা আক্তারের মৃত্যুর কারণ জানতে চেয়েছেন”।
তন্ময় তানজিমের ফেসবুকের টাইম লাইন সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও শহরের কলেজপাড়া এলাকায়া প্রত্যাশা আক্তার নামে একটি মেয়ের সাথে ভাই-বোনের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে তাদের মাঝে। তারা প্রায় একে অপরের সাথে চ্যাটিং এর মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতো।

২৯ জুলাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাস্টাস দিয়ে ঘুমের ওষুধ খেয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন প্রত্যাশা নামে এক তরুণী। ফেসবুকে পাতানো বোনের মৃত্যুতে হতাশ হয়ে পড়ে তন্ময় তানজিম। পরে জানাযা শেষে প্রত্যাশার মৃত দেহ কবরে নিজ হাতে দাফন করেন তানজিম ও অন্যান্যরা।

তানজিম তার পাতানো বোনের মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি। এর পর থেকে ফেসবুকে প্রত্যাশা আক্তারের ছবিসহ অনেকেই সমবেদনা জানালে তানজিম তার টাইম লাইনে প্রত্যাশার ছবি প্রকাশ নিষেধ করে একাধিকবার লিখেছিলেন“মানেনিতে পারতেছি না। বিশ্বাস করতে পারতেছিনা। চিৎকার দিয়ে কানতেও পারতেছি না…।

তানজিমের বাবা ওহিদুল ইসলাম জানান, দুই দিন বাসার রুম থেকে বের হওয়া ও খাওয়া দাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল সে পাতানো বোনের মৃত্যুর শোকের কারনে। আজ তানজিম আবেগের কারণে শেষ পর্যন্ত গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিবে ভাবতেই পারছি না।

তন্ময় তানজিমের এই অকাল মৃত্যু কোন মতেই মেনে নিতে পারছেন না তার মা ও ছোট ভাই। বাবা ব্যবসার কাছে বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকতো তাই দুই ভাই ও মা ছিল তাদের বন্ধু, বান্ধবী ও অভিভাবক যা ফেসবুকে বিভিন্ন সময় তিন জনের একত্রিত ছবি দেখলেই বোঝা যায়।

তন্ময় তানজিমের মৃত্যুর পর তার বন্ধু কাওসার আলম চৌধুরী ফেসবুকে লিখেছেন,“তন্ময় এই ভাবে করে চলে যাবি ভাবতেও পারিনি। কখনো তোরে বলি নাই যে তুই ছেলেটা কতটা ভাল।।। ভাল লাগতো যখন আমি রাগে থাকলে ফোন দিয়ে বলতি তুই তো আমার ভাই রে কাওসার। শুধুই সুযোগ পাইলে তোরে বন্ধুমহলে আড্ডার সময় পচাইছি। এতগুলা যায়গা তে গেলাম এত ঘুরলাম কখনো তোর কোন আচরণে মনে হয়নি যে তুই এমন করে চলে যাইতে পারিস।।। আমার আর মুজাহিদের সাথে না তুই সিলেট, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, ভারতের শিলিগুড়ি যাইতে চাইছিলি!! এভাবেই চলে গেলি রে তন্ময় অনেক মিস করবো রে তোকে। আল্লাহ তুমি তন্ময় রে জান্নতবাসী করিও।

নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক অনেকেই জানিয়েছেন, প্রত্যাশা আক্তার ও তন্ময় তানজিমের মধ্যে এমন কি সম্পর্ক ছিল যে তাদের দুজনকে অবশেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হল। না দুই জনের আত্মহত্যার পেছনে কোন অপশক্তি কাজ করছে নিজেকে আড়াল করার জন্য। এই দুটি প্রাণ অকালে ঝড়ে যাওয়ার কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্য ফেসবুককেই দাবি করেছেন অনেকেই। মঙ্গলবার আসরের নামায শেষে শহরের সেনুয়া পুরাতন গোরস্থানে জানাযা শেষে তন্ময় তানজিমের লাশ দাফন করা হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মশিউর রহমান জানান, গলায় ফাঁস দিয়ে যুবকের আত্মহত্যার কথা শুনেছি। পরিবারের কোন অভিযোগ না থাকায় আইনি কোন ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি। অপরদিকে দুই দিনের মাথায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে যুবক-যুবতীর আত্মহত্যা করাকে নিয়ে অভিভাবক ও সুশীল সমাজের মাঝে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। আর দিনদিন ঠাকুরগাঁওয়ে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়বে বলে বিভিন্ন মহল মনে করছেন। এটি প্রতিরোধের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহবান জানিয়েছেন অনেকেই।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য